বুধবার । ১১ই মার্চ, ২০২৬ । ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২

শেখ হাসিনা যাওয়ার পরই তারা বিএনপি হয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে: খালেদা বেগম

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘৫ আগস্টের পর বাড়ির পুরুষ মানুষ ভয়, আতঙ্ক, হামলা আর নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে যায়। ১২ তারিখ নির্বাচনের পর আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। আশেপাশে কয়েকদিন ছিলাম। ভাসুর, দেবর সবাই বাড়িছাড়া। ছোট জা শুধু বাড়িতে ছিল। বারান্দায় বসেছিল। তাকে ঠেসে ধরে মোবাইল নিয়ে যায়। এরপর সেও বাড়ি ছেড়ে দেয়।

শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর বাদশা গাজীকে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিছি। চাঁদা দিছি আমরা ভালো থাকবো বলে। এর কিছুদিন পর আবারও চাঁদা দাবি করে। না দেওয়ায় আমাদের বাড়িতে এসে ঘরে ঢিল মারে, অরুচিকর কথাবার্তা বলে, পোতা-পুতনি রাস্তায় উঠলে মারতে যায়। নানা ধরনের উৎপাত শুরু করে।

বড় ছেলে জাহিদুল শেখকে দোকানের সামনে থেকে ধরে এনে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। হিবজুল গাজী বক্সিং মেরে আমাকে ফেলে দেয়। এরপর লাঠি দিয়ে পেটাতে গেলে খায়রুল দারোগা ঠেকিয়ে দেয়।

২৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলে। আলমারির ভেতর যত গয়না-গাটি, নগদ টাকা-পয়সা ছিল সব নিয়ে যায়। এরপর বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এখন আমার কিছুই নেই। ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে পথে ঘুরছি, দ্বারে দ্বারে কাঁদছি। শেখ হাসিনার গণভবনের মতো আমার বাড়িও ভেঙে ফেলেছে।

আমাদের দোষ একটাই—আমরা আওয়ামী লীগ করতাম। ওরাও একসময় আওয়ামী লীগ করত। কিন্তু এখন বাদশা গাজী আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারা এখন বিএনপি হয়েছে। শেখ হাসিনা যেদিন চলে গেছে, সেদিন থেকেই তারা বিএনপি হয়েছে। এতদিন আওয়ামী লীগ ছিল, এখন বিএনপি হয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে।

তারা বলছে আমরা বাড়িতে ফিরতে পারবো না। মাথা গোঁজার ঠাঁই দিবে না। বড় ছেলে বাড়িতে এলে তাকে মেরে ফেলবে, হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে দেবে। আমরা কী অপরাধ করেছি? আমার ছেলে-মেয়েরা কী অপরাধ করেছে?’

এভাবেই নিজের দুঃখ-কষ্ট, অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের কথা জানান তিন ছেলে, এক মেয়ে, পুত্রবধূ ও পোতা-পুতনি নিয়ে বাড়িছাড়া খালেদা বেগম। বর্তমানে তিনি তেলিগাতী ল্যাবরেটরি মোড়ে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তেলিগাতী কুয়েট রোড সংলগ্ন খুলনা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

খালেদা বেগম খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের ডোমরা গ্রামের পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কনস্টেবল মরহুম জাফর শেখের স্ত্রী। স্বামীর পেনশনের টাকায় নির্মিত দোতলা বাড়িতে তিন ছেলে, পুত্রবধূ ও পোতা-পুতনি নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিলেন।

খালেদা বেগমের অভিযোগ, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি গাজীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাদশা গাজীর নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত তার বাড়ির দোতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত শাবল ও হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে তছনছ করে। লুট করে নিয়ে যায় জানালার গ্রিল, আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজ, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার।

ঘটনার পর তার বড় ছেলে জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে বাদশা গাজী, আকরাম গাজীসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে দিঘলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে আসামিরা দ্রুতই জামিনে বের হয়ে আসে। এরপর মামলার প্রধান আসামি বাদশা গাজী বাদী জাহিদুল শেখকে নানা ধরনের ভয়-ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

খালেদা বেগম বলেন, ‘মামলা করার পর জামিনে বের হয়ে আবার দুইটা ঘর ভেঙে ফেলেছে। ঘরের টিন খুলে নিয়ে গেছে। দেড়শ’ মণ ধান ছিল, সেটাও নিয়ে গেছে। ধানের গোলা ভেঙে রেখে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কষ্টে আছি। সরকার ও প্রশাসনের কাছে বিচার চাই। আমার ঘরবাড়ি ঠিক করে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, যেন ছেলে-মেয়ে, বউ ও পোতা-পুতনি নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরতে পারি।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ করার অভিযোগ অস্বীকার করে বাদশা গাজী খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘আমি জীবনে কোনোদিন আওয়ামী লীগ করিনি। জন্মলগ্ন থেকে আমরা সবাই বিএনপি করি। আমার চাচা ওবায়দুর রহমান হামিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ছিলেন।

২০০৩ সালে আমি হামিদপুর ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম। এরপর হামিদপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। দিঘলিয়া উপজেলা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং ২০০৯ সালে জেলা যুবদলের সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ছিলাম।

২৫ বছর ধরে আমি গাজীরহাট ইউনিয়নের পার্মোচন্দ্রপুর গ্রামে বসবাস করছি। ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত গাজীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমি। বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণেই ওই বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে।’

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন