ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী, সংগঠক পরবর্তীতে নেতা। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ছাত্র ইউনিয়নকে খুলনার তৃণমূলে পৌঁছানোর অন্যতম এক সংগঠক তিনি। তার নেতৃত্বেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, থানা ও কলেজ পর্যায়ে এ সংগঠনের বিস্তৃতি। বলা চলে কোনো ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন হলে ছোট্ট একটি লিফলেট নিয়ে স্কুল-কলেজে ছুটতেন। এই ধারাবাহিকতায় মানববন্ধন করতেন খুলনা নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে। এ ছাত্র সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে অনেক কলেজে সংগঠনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। গড়ে ওঠে সংস্কৃতিকর্মী, আবৃতিকার, নাট্যকার ও ফুটবল খেলোয়াড়।
পাকিস্তান জমানায় ছাত্র রাজনীতির পদপাঠ ছিল বিএল কলেজ। ছাত্র ফেডারেশনের বিলুপ্তির পর ছাত্র ইউনিয়ন আধিপত্য বিস্তার করে। এখানকার ছাত্র সংসদে ভিপি-জিএস নির্বাচিত হয়েছেন গাজী শহিদুল্লাহ, মোল্লা বজলুর রহমান, সাদেকুর রহমান মিয়া, মালিক আতাহার উদ্দিন, সৈয়দ দীদার বখত প্রমুখরা। স্বাধীন বাংলাদেশের আমলে এ কলেজের ছাত্র সংসদ দখল করা ছাত্র ইউনিয়নের জন্য কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। ত্যাগ, শ্রম ও মেধা দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। দলের প্যানেলের বহর থাকলেও ভিপি পদে মাত্র তিনিই নির্বাচিত হন। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এই ইমেজ থাকতে-থাকতে ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। দিনরাত কাটতো দাদা ম্যাচ, বিএমসি, প্লাটিনাম, জুট প্রেস বেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন, বাইন্ডিং শ্রমিক ইউনিয়ন ও সংবাদপত্র শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে। টিইউসির সেই দাপট আজ আর নেই। শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য থাকতেন সবসময় মাঠে-ময়দানে।
শিক্ষা জীবন শেষে বেছে নিলেন আইন পেশা। এখানেও নেতৃত্বে আসেন। সর্বস্তরের আইনজীবীদের সমর্থন কুড়াতে সক্ষম হয়। স্বল্প দিনের মধ্যে তার পরিচিতি শহর ছাড়িয়ে অন্যত্র পৌঁছায়। চারবার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বলা চলে স্বাধীনতা উত্তরকালে একটি রেকর্ড। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চেতনার পক্ষে। ছাত্র জীবনে অস্ত্র হাতে লড়াই করে শত্রুকে পরাস্ত করেন। লাল-সবুজের এই পতাকা ছিল তার জীবনের মত প্রিয়। এই চেতনাকে তিনি আজীবন ধারণ করেছেন। এ ধরনের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা। একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির বিপক্ষে শহরে জনমত সৃষ্টির জন্য ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গড়ে ওঠে।
এ কমিটির এক কর্মসূচিতে জনতার মিছিল হাদিস পার্ক থেকে পার হয়ে শান্তিধাম ক্রস করার সময় একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ছাত্র শিবিরের সংগঠক আমিনুল ইসলাম বিমান খুন হন। এ মামলায় ফিরোজ আহমেদকে হাজত বাস করতে হয় কয়েক মাস। পরবর্তীতে তিনি রেহাই পান। কর্মজীবনে বিশ্রাম নিতে পারেননি। নাগরিক আন্দোলনের সাথে জড়ান নিজেকে। মশক নিধনে মশারি মিছিল, পানির সংকটে কলস মিছিল, জ্বালানি তেলের সংকটে মানববন্ধনে তিনি অগ্র সৈনিক। দেশব্যাপী তেল নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনায় এই মানুষটি অনুপস্থিত। অবচেতন মন মনে করিয়ে দেয় শহরের কেন্দ্র বিন্দুর মানববন্ধনে ফিরোজ আহমেদের বলিষ্ঠ স্লোগান। লিফলেট হাতে-হাতে নগরবাসীর দুয়ারে-দুয়ারে তিনি বেড়াতেন। মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। মানুষের আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে কেসিসি’র নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হন। দলের যে সমর্থক, যে পরিমাণ সদস্য তার তিন গুণ ভোট তিনি পান। বিষয়টি সকল মহলের আলোচনায় আসে। কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে তাকে নিয়ে। দলের চেয়ে নেতার গুরুত্ব বেড়ে যায়।
একপর্যায়ে এ আন্দোলন থেকে তিনি সরে যান। তারপরও নগরবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে থাকতেন ইস্যুভিত্তিক নানা আন্দোলনে-মানববন্ধনে। এক যুগ আগে তিনি চির বিদায় নিয়েছেন। তার কর্ম আজও মানুষের মুখে-মুখে। তেল সংকটের এই মুহূর্তে মনে পড়ে এই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরটিকে। তার আদর্শ, দর্শন ও অর্থনীতির সাথে কখনও একমত পোষণ করতে পারিনি। কিন্তু ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে তার থেকে দূরে থাকা কষ্টসাধ্য ছিল। কোনোক্রমেই ছাড়তেন না। সময়ের প্রয়োজনে, পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে থাকতে হতো তার এই কাফেলায়। মনে পড়ে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত তেল সংকটের এই মুহূর্তে সেই চির পরিচিত স্লোগান আজ না ফেরার দেশে। তার সংগ্রামী জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এ নগরবাসী শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তার সংগ্রামী জীবনকে।
খুলনা গেজেট/এনএম

