পাকিস্তান জমানায় খুলনার সংবাদপত্রের বিকাশ ঘটে। ৪৭ সালের পর ছিল কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। দৈনিকের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে। এ সময়ের পত্রিকা দু’টির নাম ডেইলি নিউজ ও পত্রিকার খবর। মূলত : পত্রিকা দুটি ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে। অর্থাৎ পাকিস্তান দ্বিধা-বিভক্তি হোক এটা তারা চাইনি। এ দু’টির সম্পাদক ছিলেন মঈন পায়ামী। তিনি অ-বাঙালি। বিজয়ের প্রাক্কালে মোংলা বন্দর দিয়ে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পাকিস্তান জমানায় এখানকার সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল জনবার্তা, দেশের ডাক, স্বাধিকার, ওয়েভ, মাদারল্যান্ড, কালান্তর, আওয়াজ, মাসিক কিচিরমিচির ইত্যাদি।
দৈনিক মূলত : ১৯৭৪ সাল থেকে। জনবার্তা খুলনার প্রথম দৈনিক। সম্পাদক ছিলেন মরহুম সৈয়দ সোহরাব আলী। এটির প্রকাশনা আজ নেই। পরবর্তীতে সাপ্তাহিক জন্মভূমি আত্মপ্রকাশ করে। তার আগ থেকে দৈনিক পূর্বাঞ্চলের প্রকাশনা। সামরিক শাসক জে : এরশাদের শাসনামলে ১৯৮২ সালের ১৪ এপ্রিল জন্মভূমি দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ পত্রিকার প্রকাশনা লগ্নে যারা ছিলেন, তারা আজ আর পৃথিবীতে নেই। ৬৯’র ছাত্রনেতা হুমায়ুন কবীর বালু পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। তিনি একসময় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। বার্তা বিভাগে ছিলেন ওয়াদুদুর রহমান পান্না, রফিকুজ্জামান, কামরুল মুনীর, অরুণ সাহা, কবীর জাহাঙ্গীর প্রমুখ। তারা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে আজ অনেক দূরে। জন্মভূমির দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশে বেশ সাজসাজ রব পড়ে। আজকের প্রজন্মের কাছে এটি বোধগম্য হবে না। সীসার নতুন টাইপে প্রকাশিত হয়। ছাপা ছিল ঝকঝকে। সহজে পাঠককে আকর্ষণ করে।
বলা চলে, সেই ৪৪ বছর আগে আধুনিকতার ছাপ ছিল পত্রিকাটিতে। প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামরুল মুনীর। তিনি এক সময় আবির্ভাব, সাপ্তাহিক পদধ্বনি ও রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সরকারি দৈনিক বার্তার প্রতিনিধি ছিলেন। প্রতিবেদনের পাশাপাশি উপ-সম্পাদকীয়ও লিখতেন। তার একটি জনপ্রিয় কলাম ছিল, ‘কানা বুড়ি’। খুলনা বেতারের ‘আয়না’ অনুষ্ঠানের ন্যায় ‘কানা বুড়ি’ ও জনপ্রিয় ছিল। জন্মভূমির আত্মপ্রকাশের আগে এ শহরে সংবাদপত্রে অ্যাসাইনমেন্ট প্রথা চালু ছিল না। এ পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক-ই অ্যাসাইনমেন্ট প্রথা চালু করেন। ছিল কড়া নিয়ম-নীতি। এক কথায় বলা চলে তরুণ প্রতিবেদককে প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রতিবেদনের জন্য তথ্য নিয়ে আসতেই হবে। চালু হয় নোটবুক। অনেকেই বলতেন ‘রিপোর্টারের নোটবুক’। সে যেন এক আজব জগৎ।
আজকের মতো কম্পিউটারের বা আধুনিকতার কোনো ছাপও ছিল না। প্রতিবেদককে কাগজে লিখতে হত। পেছনের পাতায় থাকতো হেডিং। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো দু’তিন জন দক্ষ সাংবাদিক দেখতেন। তখনও সহ-সম্পাদকের সম্পাদনার বিষয়টি চোখে আসেনি। রাতে অফিস ত্যাগ করার আগে জন্মভূমির প্রধান প্রতিবেদক পরের দিনের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিতেন। এ এক গুরু দায়িত্ব। গন্ধ শুঁকে সংবাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ বার্তা বিভাগে আনতেই হবে। কোনোক্রমেই ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে জবাবদিহি করতে হত। তিনি এভাবেই তরুণদেরকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। অনেকেই সফলতা অর্জন করেছে। আর এর পেছনের নেপথ্যের নায়ক ছিলেন তিনি। তার নীতি, নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে তরুণদের একটা অংশ গড়ে ওঠে। এটি ছিল তার ওপর আকর্ষণ ও অগাধ বিশ্বাস।
এই তরুণদের ওপর নির্ভর করে তিনি হাল ধরেছিলেন সময়ের খবর নামক দৈনিকের। স্বল্প দিনে পত্রিকাটি পাঠক প্রিয় হয়ে ওঠে। বেশি দিন স্থায়িত্ব হয়নি। হঠাৎ করে তার শরীরের সক্ষমতা কমতে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যান। স্ব-শরীরে আর ফিরে আসতে পারে নি। তার লাশ ফিরে আসে। সংবাদপত্রের পাশাপাশি আইন পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এখানেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। দায়িত্ব পালন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি হিসেবে। আইন পেশায় প্রতি বছর প্রতিনিধি নির্বাচন হয়। তিনি কয়েকবার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও মেট্টোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনী কর্মকর্তারও দায়িত্ব পালন করেন। এ সব ক্ষেত্রে তার বিচরণ ছিল দীর্ঘদিনের। স্বচ্ছতার কারণেই এ সব সেক্টরে তিনি সফলতা পেয়েছেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

