নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার সূচনালগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাদাসিধে চলন-বলন, পোশাক, আন্তরিকতা ও দেশ গঠনের ঘোষিত অঙ্গীকার ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে শুরুতেই ভুল নিয়োগ, অযাচিত আস্থা বা প্রশাসনিক দুর্বলতা যেন এই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে- সে বিষয়ে সতর্ক ও কৌশলী দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম শর্ত হলো মিত্র ও প্রতিপক্ষকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসা জনগণ নতুন করে কোনো অস্থিতিশীলতা চায় না। নির্বাচনের পর নিষিদ্ধ ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর পুনরুত্থানের ইঙ্গিত জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারকে দৃঢ় ও ন্যায়সংগত অবস্থান নিতে হবে। জনগণের আবেগ ও প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
নবগঠিত মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক বার্তা ও আচরণের সমন্বয় থাকা জরুরি। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্য, প্রকাশভঙ্গি ও রাজনৈতিক অবস্থান যেন সরকারের ঘোষিত নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এজন্য একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সমন্বয় ও শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। (বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খানের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা এ ধরনের দায়িত্ব কার্যকর ভাবে পালন করতে পারেন বলে ধারণা করি) অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত মন্তব্য এড়িয়ে সংযত ও একীভূত বার্তা প্রদান- সরকারে স্থিতিশীলতা এনে দেবে।
গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়- বিশেষত শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্য ও নারী বিষয়ক খাত- আদর্শিক ও নীতিগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব দপ্তরে সৎ, দক্ষ ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া উচিত। বড় বাজেট বা প্রভাবশালী মন্ত্রণালয়ে আর্থিক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ কাউকে নিয়োগ না দেওয়া এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দৃশ্যমান করা আবশ্যক।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জনমত গঠনের প্রধান ক্ষেত্র। অতীতে মূলধারার গণমাধ্যমে রাজনৈতিক ভারসাম্যের অভাব ছিলো; বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম সেই শূন্যতা পূরণ করেছে। তাই তথ্য যুদ্ধ, ভুয়া প্রচার ও গুজব মোকাবিলায় সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন। সরকারের সাফল্য, নীতি ও কর্মসূচি সঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে না পারলে বাস্তব অগ্রগতিও আড়াল হয়ে যেতে পারে।
মন্ত্রিসভার আকার ও ভারসাম্য নিয়েও কৌশলগত পরিকল্পনা দরকার। শুরুতেই বড় আকারের মন্ত্রিসভা গঠন- দল ও জোটের ভেতরে প্রত্যাশা ও বঞ্চনার মনস্তত্ত্ব তৈরি করতে পারে। মন্ত্রিত্ব না পাওয়া প্রবীণ ও নবীন নেতাদের আক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে দলীয় সংহতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই মন্ত্রিসভার কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন, দায়িত্ব বণ্টনে ভারসাম্য এবং বিকল্প সম্মানজনক দায়িত্ব প্রদান গুরুত্বপূর্ণ।
জোট সরকারের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মনোনয়ন ও মন্ত্রিত্বের ভারসাম্য রক্ষা না করলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি হয়। ২০০১৬ সময়কালে মরহুমা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জোটসঙ্গীদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করেছিলেন, যা দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক ছিলো। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারকে সুসংহত ও নীতিনিষ্ঠ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। জোট থেকে নির্বাচিত এমপিদের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা নিষ্প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ জটিলতার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও ধারাবাহিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের অপসারণ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বার্তা ও আইনি প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। উদাহরণ স্বরূপ, আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে অপসারণের মতো সিদ্ধান্ত যদি পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ও যুক্তি ছাড়া নেয়া হয়, তা অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সবশেষে, দলের ভেতরের ক্ষোভ, অভিমান ও অপ্রকাশ্য দ্বন্দ্বকে অবহেলা করা যাবে না। অতীতে এ ধরনের উপেক্ষা নেতিবাচক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। যেমন, খুলনার নির্বাচনী ২ আসনসহ সারাদেশের কয়েকটি নিশ্চিত আসনে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। জনমনে গুঞ্জন আছে, এসব আসনে বিএনপি’র পরাজয়ের প্রধান কারণ দলীয় কোন্দল, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। এই বিষয়গুলো ভবিষ্যতের জন্য নিরপেক্ষ ভাবে দলীয় তদন্ত ও প্রতিকার প্রয়োজন।
দলে অন্তর্গত সমন্বয় ও আস্থার পরিবেশ তৈরি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তা, ন্যায়বোধ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ই হতে পারে- তারেক রহমানের টেকসই সাফল্যের সিঁড়ি।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

