মঙ্গলবার । ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩২

বঞ্চনার অবসানের প্রত্যাশায় খুলনাবাসী

আবদুল কাদের খান

‘অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়।’ সত্যিই অভাগা বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চল-খুলনা। নয়া সরকারের যাত্রা শুরু হয় গত মঙ্গলবার ১৭ই ফেব্রুয়ারি। সারাদেশের মতো খুলনার মানুষও মুখিয়ে ছিল। পার্লামেন্টে দীর্ঘ দেড় যুগ পর কি হতে চলেছে, কারা মন্ত্রিপরিষদে আসছে? পরে স্পষ্ট হলো,- “বিভাগের সবচেয়ে বেশি আসনে সরকারি দলের জয়, তারপরও মন্ত্রী শূন্য খুলনা।” শুনতে বেশ ভালো লাগলো। কষ্টের ভালো। ভাগ বাটোয়ারা সম্ভবত : রাজধানী ঢাকা। তারপর বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। তারপর রাজশাহী, ময়মনসিং, রংপুর, বরিশাল, পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে খুলনা পর্যন্ত আসতে আসতে মন্ত্রিপদ জিরোর কোঠায় পৌঁছেছে!

হায়রে ইনসাফের বাংলাদেশ!

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ব্রিটিশ আমল থেকেই এই দক্ষিণাঞ্চল দারুণ ভাবে শোষিত বঞ্চিত। কলকাতা সিটি কর্পোরেশন সুতানটি শহর, সবকিছুই পূর্ব বাংলার এই অঞ্চলের কৃষকদের হাড় ভাঙা খাটুনির রক্ত ঘামের অর্থ দিয়ে গড়ে উঠেছে। যশোর খুলনা নড়াইল সাতক্ষীরা বাগেরহাট কুষ্টিয়া মাগুরা ঝিনাইদহ সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ উৎপাদন করে রূপালী সোনা অর্থাৎ চিংড়ি। শাক- সবজি, খাদ্যশস্য। এই অঞ্চলের আকাশ ছোঁয়া সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অঞ্চলটি দারুণভাবে উপেক্ষিত। খুলনা অঞ্চলের মানুষ মারাত্মক সরল, এক নীতির এবং নিরীহ। তাই এই অঞ্চলকে বারবার বঞ্চনার শিকার হতে হয়। খুলনা অঞ্চলের উন্নয়ন, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের মানুষ দারুণভাবে বঞ্চনার শিকার। জানিনা এ বঞ্চনার শেষ হবে কবে? আদৌ হবে কী-না তাও স্পষ্ট করে বলা কঠিন!

ভাগ বটোয়ারা হয় উপরের দিকে। দক্ষিণ অঞ্চলের ভাগ্যে পড়ে শূন্য। অথচ অর্থনীতির বিরাট অংশ জোগান দেয় এই খুলনা অঞ্চল। কী দারুণ ভাগ্যের পরিহাস!

ব্রিটিশ শাসনামলে নীলকর দস্যুরা এই খুলনা অঞ্চলকে নানাভাবে শোষণ, লুণ্ঠন করেছে। ওই সময় কৃষকের সবচেয়ে উর্বর জমিন নীল দস্যুরা জোরপূর্বক নীল চাষে ব্যবহার করত। কৃষক থাকতো অনাহারে। প্রতিনিয়ত হতো জুলুমের শিকার। ঝিনাইদহ মাগুরা খুলনা যশোর কুষ্টিয়া ফরিদপুর সাতক্ষীরা দীর্ঘকাল বঞ্চনার শিকার। এই অঞ্চলে ব্রিটিশের সূর্য অস্ত যেত না কোনোভাবে। তাদের জুলুমবাজী হেনস্তার শিকার হতো এই অঞ্চলের নিরীহ মানুষ। আজও সেই ভাগ্য! এই বঞ্চনা অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ এর সাথে সখ্যতার সুবাদে তৎকালীন হিন্দু জমিদাররা পূর্ব বাংলার কৃষি জীবী পরিবারের উপর বেশি বেশি জুলুম করতো। তাদের শ্রম উৎপাদন লুণ্ঠন করে কলকাতা শহরে প্রাসাদোপম অট্টালিকা তুলে রাজকীয় জীবনযাপন করতো। এইতো সেদিনের কথা। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য জমিদার শ্রেণি কর খাজনা বাকির অজুহাত তুলে কৃষকের উপর নানা ভাবে জুলুম করে তাদের উৎপাদিত পণ্য নিজেদের ভোগ বিলাসে ব্যয় করত। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা শহরের জৌলুস বাড়িয়েছিল এই দক্ষিণ অঞ্চলের, খুলনার হতভাগা কৃষিজীবী পরিবারের মানুষেরা। বিনিময়ে নিজেরা থাকতো শূন্য হাতে, দারিদ্রতার রাজত্বে বন্দী।

পরের অধ্যায়ে, ১৯৪৭ সালে পার্টিশন বা ভারত বিভক্তির পর বিত্তশালী হিন্দু জমিদার যারা নড়াইল যশোর এবং খুলনা অঞ্চলে বাস করত তারা দরিদ্র কৃষকের উপর স্বেচ্ছাচারিতা ও লুণ্ঠন চালাতো, তারা ভারত বিভক্তের পর পরই ইন্ডিয়ায় বিশেষ করে কলকাতায় চলে যায়। বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলার এই অঞ্চলে শিক্ষা দীক্ষা, সাহিত্য সংস্কৃতি, ধর্ম কর্ম মর্ম সবই ছিল দারুণ ভাবে উপেক্ষিত। বিশেষ শ্রেণির কবজায়। পাকিস্তান আমলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬/৫৭ পর্যন্ত নানা বিশৃঙ্খল পথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনকার্য দারুণ অস্থিরতার সাথে চলতে থাকে। পরে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে গান পয়েন্টে বা বন্দুকের নলের মুখে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। সর্বসের্বা হয়ে ওঠেন ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। তিনি ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থাৎ সমগ্র পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বা ফৌজি প্রধান।

ওই সেনা প্রধান আইয়ুব খান পূর্ব বাংলার এই অঞ্চলে অর্থাৎ খুলনা অঞ্চলে ষাটের দশকে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী খান এ সবুরের সাথে হৃদ্যতার কারণে খুলনার খালিশপুর অঞ্চলে শিল্প কারখানা গড়ে তোলেন। খুলনার খালিশপুরের নিউজ প্রিন্ট মিল ছিল এশিয়া বিখ্যাত কাগজের কল। খুলনার খালিশপুর অঞ্চলে জুবিলী, ক্রিসেন্ট জুট মিল, প্লাটিনাম জুট মিল, স্টার জুট মিল সহ অসংখ্য মিল কারখানা, পাটকল গড়ে ওঠে। এই অঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের বেকারত্ব দূরীকরণ এর জন্য। কৃষিজীবী মানুষ পাট উৎপাদনে উৎসাহ পায় এবং অনেকেই এই মিলকারখানায় শ্রম ঘনিষ্ঠ হয়ে জড়িয়ে পড়ে শ্রমিক হিসেবে। এভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৩ বছরে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির পথে অগ্রসর হচ্ছিল খুলনা শহর তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহ।

পাকিস্তানিরা অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী এইসব উৎপাদনের ফসল নিজেরাই লুণ্ঠন করত। বঞ্চনার শিকার হচ্ছিল এই অঞ্চলের মানুষ। ২৪ বছরের বঞ্চনা দূঃশাসনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৭১ রক্ত ঝরে বাঙালি খেটে খাওয়া পরিবারের অত্যন্ত প্রতিবাদী সন্তানদের। মিছিলের আগেভাগে থেকে তারাই জীবন দেয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হয় এ অঞ্চলের নিপীড়িত কৃষিজীবী পরিবারের মানুষদের।

১৯৬৯ এর ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে হাদিস প্রদীপ আলতাফ জীবন বিসর্জন দেয় পুলিশের গুলিতে। আমরা কয়জনই বা তাদের কথা মনে রেখেছি? ১৯৭১ এর রণাঙ্গনে ৯ মাস যুদ্ধ শেষে পাওনার বেলা খুলনার হাতে শূন্য পড়ে। কি বিচিত্র ইতিহাস তাই না? এটাই রিয়েলিটি এটাই বাস্তবতা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিন একাডেমি, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, শিক্ষা বোর্ড অফিস প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে দেশ স্বাধীনের পর থেকে অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে আমরা বক্তব্য- বিবৃতি দিয়ে শাসকদের কোনোভাবে টনক নড়াতে পারিনি।

খুলনা যে তিমিরে সেই তিমির এই রয়ে গেল। বরং উপেক্ষার নজির হিসেবে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ মিল খালিশপুরের নিউজপ্রিন্ট মিলের আয় উৎপাদন লুণ্ঠন করে সচ্ছল কাগজের কল খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিলটি লোকসানের ঘানি টানতে টানতে সরকারি দলের লোকদের স্বেচ্ছাচারিতায় একসময় বন্ধ হয়ে যায়। এমনটি যদিও হবার কথা ছিল না। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসকের তদারকিতে খুলনা অঞ্চলের অধিকাংশ মিলকারখানার যন্ত্রাংশ খুলে খুলে পার্শ্ববর্তী দেশে সুকৌশলে পাচার করা হয়। বাংলাদেশের ডান্ডি বলে পরিচিত খুলনার খালিশপুর অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল খ্যাতি হারিয়ে আস্তে আস্তে লুট ও পাচারের কারণে বিধ্বস্ত শিল্প নগরীতে পরিণত হয়।

শেখ মুজিব সরকারের ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্ট পর্যন্ত বেপরোয়া লুন্ঠনে শিল্প নগরী খুলনাকে বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত করে। সেই শিরদাঁড়া ভাঙা খুলনা আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর জিয়াউর রহমান সরকার আসলেও খুলনা নিজস্ব অধিকার, সামগ্রিক উন্নয়ন এমনভাবে একটা আলোর মুখ দেখেনি। বলতে গেলে এমন কথা এসে যায় যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে খুলনা বিভাগের ৩৬ টি আসনের মাত্র ১১ টি তে জয় পেয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে চারটি আসনই খুলনা জেলার। খুলনা জেলা সবচেয়ে বেশি আসন জয় করে জাতীয়তাবাদী দল অর্থাৎ বিএনপি চেয়ারম্যান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উপহার দেওয়া সত্ত্বেও খুলনার প্রতি মন্ত্রীত্বের সুষম বণ্টন না হওয়ায় খুলনার নাগরিক সমাজ মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের পর দারুণভাবে হতাশ হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠান শেষে খুলনার সর্বস্তরের মানুষ মনে করে, খুলনার প্রতি ন্যায্য আচরণ না করে, একেবারে শূন্য উপহার দেওয়া হয়েছে। অতীতের মতো বিএনপি’র বর্তমান সরকার আমলেও মন্ত্রীত্বের হালে পানি পায়নি খুলনা জেলার কেউ।

অতীত থেকে পুরাতন নথি ঘেঁটে দেখা গেছে- ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে বিএনপি’র তিনটি সরকারের আমলে এ পর্যন্ত খুলনা থেকে কেউ মন্ত্রী হননি। অথচ তুলনামূলকভাবে গত ১৮ বছরে আওয়ামী লীগের পাঁচটি সরকারের মন্ত্রিসভার প্রতিটিতেই খুলনা থেকে পূর্ণ মন্ত্রী অথবা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভায় খুলনা থেকে নির্বাচিত যেকোনো সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘ সময় ধরে বঞ্চনার অবসানের দাবি ছিল, খুলনার নাগরিক সমাজের, বিশিষ্টজনদের। বিএনপির অ্যাকটিভ কর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের। কিন্তু মন্ত্রী পরিষদ গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শপথ নেবার পর দেখা গেল, খুলনার কেউ নেই। খুলনা বাসীর দীর্ঘদিনের কোনো স্বপ্নই পূরণ হলো না।

স্মরণ করা দরকার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগে ছয়টি জেলার সবগুলো আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত প্রার্থীরা। এমনকি ব্রিটিশ আমল থেকে পুরোনো এবং বড় জেলা যশোর এর ছয়টি আসনের পাঁচটিতেই পরাজিত হয়েছে বিএনপি। বাগেরহাটের চারটির মধ্যে তিনটিতেই জয় পেয়েছে জামাত। ব্যতিক্রম শুধু খুলনা। এখানকার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতেই বিজয় পেয়েছে বিএনপি প্রার্থীরা। এজন্য মন্ত্রিসভার খুলনা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে খুলনা জেলা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা উচিত ছিল। বিভাগীয় শহর খুলনা সদরে কোনো মন্ত্রী না থাকায় খুলনা বিভাগ যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার অতি অচিরেই এ ধরনের বঞ্চনার অবসান ঘটাবেন। ব্যাঘ্র তটভূমি সুন্দরবনের গা ঘেঁষে বহু ইতিহাসখ্যাত বিপ্লবী ইতিহাসের রচয়িতা খুলনা শিল্প বন্দর নগরী, মংলা পোর্ট সাতক্ষীরা সীমান্ত ঘেঁষা খুলনাকে মন্ত্রিত্ব শূন্য করে অন্ধকারে রাখা বোধহয় উচিত হবে না বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল কী ভাবছেন সেটাই এখন দেখার বিষয়। নিবেদন ইতি…

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন