বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

কুয়েটে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এমইআরসি ল্যাবের যাত্রা শুরু

একরামুল হোসেন লিপু

দেশের অন্যতম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এ আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ‘মেটেরিয়ালস অ্যান্ড এনভারমেন্টাল রিসার্চ সেন্টার’ (এমইআরসি) ল্যাবের যাত্রা শুরু হয়েছে। একই ছাদের নিচে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত এমইআরসি ল্যাবের মূল আকর্ষণ হলো উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সমাহার। যা গবেষকদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সলিউশন’ হিসেবে কাজ করবে। ল্যাবটি কুয়েটে উন্মোচনের ফলে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল তথা সারা দেশের গবেষণা খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও নির্মাণ শিল্পগুলোর কাঁচামালের গুণগত মান ও চূড়ান্ত পণ্যের নিরাপত্তা যাচাইয়ে ল্যাবটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এতে করে দেশীয় শিল্পের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হল।

এছাড়া ল্যাবটিতে দেশের প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং পিএইচডি/এমএস গবেষকদের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হলো। ইতিমধ্যে গবেষণাগারে ৮০ শতাংশ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ ইকুপমেন্ট খুব দ্রুতই আনা হবে।

এমআরসি সূত্রে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘Expansion of infrastructure and Academic Activities of Khulna University of Engineering &Technology’ প্রকল্পের আওতায় ল্যাবটি স্থাপিত হয়েছে। আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ হবে। এখন থেকে দেশের উচ্চশিক্ষা ও শিল্প গবেষণার ক্ষেত্রে নিরব বিপ্লব ঘটাতে প্রস্তুত কুয়েটে স্থাপিত এ ল্যাব সেন্টারটি। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যাব সেন্টারটিতে যে সকল অত্যাধুনিক ও উচ্চ বাজার মূল্যের মূল্যবান সরঞ্জামাদি স্থাপন করা হয়েছে এর মধ্যে কিছু মেশিন রয়েছে যেটি বাংলাদেশে প্রথম আমদানিকৃত।

ইতঃপূর্বে দেশের গবেষকদের এ ধরনের সংবেদনশীল পরীক্ষাগুলো বিদেশে নমুনা পাঠিয়ে করতে হতো। যা ছিল সময় সাপেক্ষ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পূর্ণাঙ্গভাবে এ ল্যাব সেন্টারটির কার্যক্রম চালু হলে দেশীয় গবেষকদের ওই ব্যয়ভার বহন করতে হবে না, ফলশ্রুতিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। ২০২৪ সালে কুয়েট ল্যাব সেন্টার হিসেবে এটি ইউজিসি’র অনুমোদন লাভ করে।

ল্যাবটিতে রয়েছে ন্যানো টেকনোলজি। যেটি আনবিক বা পারমানবিক স্কেলে (১ থেকে ১০০ ন্যানো মিটার) পদার্থের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করার প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি পদার্থকে ক্ষুদ্রতম স্তরে পরিবর্তন করে নতুন উপাদান এবং উচ্চ কার্যকারিতা সম্পন্ন পণ্য তৈরি করে। যা ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা, শক্তি উৎপাদন এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

এছাড়া ল্যাব সেন্টারটিতে দু’কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৩০০ টন বল প্রয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইউনিভার্সেল টেস্টিং মেশিন (UTM) আনা হয়েছে যেটি উচ্চ শক্তি সম্পন্ন কংক্রিট বা স্টিল বারের চাপ ও টান সহনশীলতা পরীক্ষা করতে সক্ষম। দেশের অবকাঠামগত গবেষণায় এটি একটি জাতীয় সম্পদ। ল্যানটিতে রয়েছে X-ray Photoelectron  spectroscopy (XPS) যেটি উপাদানের পৃষ্ঠের রাসায়নিক অবস্থা ও ইলেকট্রনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে। সেমিকন্ডাক্টর, অনুঘটক এবং উন্নত উপাদান গবেষণায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মেশিন।

রয়েছে ICP-MS ও GCMS যেটি পরিবেশগত নমুনা যেমন (পানি, মাটি, বাতাস) এবং জটিল জৈব মিশ্রণে অতি স্বল্পঘনত্বের ট্রেস উপাদান নির্ণয় করতে সক্ষম। এটি পরিবেশ বিজ্ঞান কেমিক্যাল ও খাদ্য গবেষণার মান নিশ্চিত করবে।

কুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও এমইআরসি’র পরিচালক ড. মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেন, “কুয়েটের মডার্ণ ইকুইপমেন্ট এন্ড রিসার্চ সেন্টারে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অ্যাডভান্স ম্যাটিরিয়ালস ক্যারেক্টারাইজেশন ইকুইপমেন্ট রয়েছে, যার মাধ্যমে ন্যানো-ম্যাটিরিয়ালস, কম্পোজিট, জৈব ও অজৈব, পরিবেশ দূষণ, সেমিকন্ডাক্টর, পলিমারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্লেষণ করা সম্ভব। যার মধ্যে এমন কিছু ইকুইপমেন্ট রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশে প্রথম যেমন-এক্সপিএস, টেম।

এছাড়াও এখানে রয়েছে এফইএসইম, এসইম, এক্সআরডি, ডব্লিউডি এক্সআরএফ, এফটিআইআর, আইসিপিএমএস, জিসিএমএস, ইউটিএম, এয়ার মনিটরিং ইকুইপমেন্ট। যার মাধ্যমে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক পর্যায়ের গবেষণা করা এখন সহজ থেকে সহজতর হয়েছে। ইতোমধ্যে উক্ত সেন্টারের সুযোগ সুবিধা শুধু কুয়েটের শিক্ষার্থী নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ গ্রহণ করছে।

এছাড়াও আরও কিছু ইকুইপমেন্ট খুব দ্রুত আমাদের সেন্টারে যুক্ত হবে। তা হলো-ডিএসসি টিজিএ, বেট, পার্টিকেল সাইজ এনালাইজার, রামান স্পেক্ট্রোমিটার, এএফএম, সিএইচএনএস এনালাইজার, ভ্যাক্যুম চেম্বার ফর ন্যানোপার্টিকেল ডিপোজিশন, এক্সরে সিটি। উক্ত ইকুইপমেন্ট গুলো শুধু গবেষণা নয়, শিল্প ও উচ্চশিক্ষা উভয় ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলবে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন