বনের ফলের বীজে হচ্ছে জ্বালানি

মাহমুদুল ফিরোজ বাবুল, শ্যামনগর

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা নদীগুলোর পাড়ে গেলেই দেখা যায় এক পরিচিত দৃশ্য। একদল মানুষ পরম মমতায় নদী থেকে ভেসে আসা ডালপালা ও লতাগুল্ম সংগ্রহ করছেন। উপকূলীয় মানুষের কাছে এই ভেসে আসা কাঠ কেবল জঞ্জাল নয়, বরং এটি তাদের সারা বছরের রান্নার প্রধান জ্বালানি এবং জীবনধারণের অন্যতম অনুষঙ্গ।

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বাজার থেকে জ্বালানি কিনা এক বিলাসিতা। তাই জোয়ারের পানিতে সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা গাছের ডাল, গোলপাতা ও বিভিন্ন পচনশীল কাঠই তাদের ভরসা।

শ্যামনগরের দাঁতিনাখালী গ্রামের সোহেলী বেগম, সোনাভানু বেগম, সেলিনা খাতুন, সাজিদা আক্তার তালবাড়ীয়া গ্রামের, করুণা রাণী, শংকরী রাণী, সুনিতা রাণীসহ বেশ কয়েকজন নারী জানান, “সুন্দরবন থেকে নানা ধরনের ডালপালা, ফল তাদের নদীর কিনারে ভেসে আসে, তারা ফলগুলো সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। মূলত ভিতরের অংশ ফেলে দিয়ে খোসাটা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করেন তবে বাইনের বীজটা আগুনে পোড়ে না বলে এটা নদীতে ফেলে দেন।”

তারা আরও জানান, “বনের কাঠ কাটা নিষেধ, কিন্তু নদী যেটা ভাসিয়ে আনে সেটা কুড়িয়ে নিতে দোষ নেই। এই কাঠ দিয়েই আমাদের ঘরের হাঁড়ি জ্বলে। যদিও ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে বাদার (বনের) অনেক ক্ষতি হয়, কিন্তু কি করার আছে, জ্বালানি কাঠের অভাবে বাধ্য হয়ে সুন্দরবনের ফলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে হয়।”

তবে কাজটা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদা-পানিতে ভিজে এই কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, যা অনেক সময় স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লোনা পানির উচ্চতা বাড়ছে। একদিকে জোয়ারের সাথে কাঠ ভেসে এলেও অন্যদিকে তীব্র জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় মানুষের ঘরবাড়ি তছনছ করে দিচ্ছে। বন বিভাগ বন রক্ষার জন্য কঠোর নিয়ম জারি রেখেছে, তবুও নদী থেকে ভেসে আসা এসব উপকরণ সংগ্রহে তারা সাধারণত মানবিক কারণেই বাধা দেয় না।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট ক্যাম্প এর অফিস ইনচার্জ জিয়াউর রহমান সুন্দরবনের ভাসমান ফল সম্পর্কে বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবনের গাছ থেকে বিভিন্ন ফল নিচে পড়ে সুন্দরবনের মধ্যে কিছু চারা গজায় এবং অধিকাংশ ফল জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে নদীর কিনারে জমা হয়। এসব ফলগুলো গ্রামের নারীরা সংগ্রহ করে নিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে একদিকে উপকূলীয় নারীদের সাময়িক জ্বালানি সমস্যার সমাধান হলেও পরিবেশের জন্য এর ক্ষতির পরিমাণ বেশি, কেননা এসব ফল থেকে প্রাকৃতিকভাবে অনেক বনায়ন গড়ে উঠত। কিন্তু উপকূলবাসীর অসহায়ত্বের কথা ভেবে আমরা কঠোর হতে পারি না।

সম্প্রতি গ্রিন কোয়ালিশন ও শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বনবিভাগ এবং শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

পরিবেশবাদী এই সংগঠনটির বক্তব্য, সুন্দরবনের নদী ও জোয়ারের মাধ্যমে ভেসে আসা বনজ বীজ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে। এসব বীজ নির্বিচারে সংগ্রহ করা হলে সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বন প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। অতএব যেকোন ভাবে এসব বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধ করতে হবে।

বনজ এসব বীজ সংগ্রহ সুন্দরবনের নতুন বনায়ন সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করছে যেমন সত্য তেমনি জোয়ারে ভেসে আসা এই কাঠ-বীজ হাজারো দ্ররিদ্র উপকূলবাসীর জীবন জীবিকার সাথে জড়িত। তাই এসব বিষয় মাথায় রেখে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এমনটা জানিয়েছেন উপকূলের খেটে খাওয়া মানুষ।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন