নবগঙ্গার ওপর স্বপ্নের কালিয়া সেতু আট বছর পর মিলছে আলোর দেখা

এসকে সুজয়, নড়াইল

বছরের পর বছর একটি সেতুর অভাবে খেয়া পারাপার, দীর্ঘপথ ঘুরে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় এটাই ছিল নবগঙ্গা নদীর দুই পাড়ের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষা, নানা জটিলতা ও একাধিক দফা সময় বাড়ানোর পর অবশেষে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে নড়াইলের বহুল প্রতীক্ষিত কালিয়া সেতুর নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে শেষ ধাপের ঢালাই, সংযোগ সড়ক ও ফিনিশিংয়ের কাজ। সেতু কর্তৃপক্ষের দাবি আগামী দুই মাসের মধ্যেই সেতুটি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত হবে।

নড়াইল-কালিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ২১তম কিলোমিটারে বারইপাড়া এলাকায় নবগঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রশস্ত এ সেতুটি চালু হলে নড়াইল সদর ও কালিয়া উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নবগঙ্গা নদীর দুই পাড়ের প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল প্রায় ৬৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নকশাগত পরিবর্তন, নদীপথে নৌযান চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে নতুন নকশা প্রণয়ন, নির্মাণাধীন পিলারে বাল্কহেডের ধাক্কায় ক্ষয়ক্ষতি এবং বিভিন্ন কারিগরি জটিলতায় প্রকল্পের মেয়াদ সাত দফা বাড়ানো হয়। সেই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৩৫ কোটি ৯২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে নির্মাণকাজে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। নির্মাণাধীন ৯ নম্বর পিলারে একাধিকবার বালুবোঝাই বাল্কহেডের ধাক্কা লাগে। পরে নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নকশা পরিবর্তন করে স্টিল আর্চ স্প্যান সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেতুর মূল স্ট্রাকচার, স্টিল স্প্যান ও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

কালিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাজী আলমগীর কবির বলেন, একটি সেতুর অভাবে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে কালিয়ার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে দুইবার নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনায় পড়েছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছি।

তিনি বলেন, এই সেতু চালু হলে শুধু কালিয়ার মানুষ নয়, নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও খুলনার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে কালিয়া থানা বা উপজেলা সদরে কোনো প্রশাসনিক কাজে যেতে প্রায় দু’ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সেতুটি চালু হলে সেই পথ মাত্র তিন থেকে চার মিনিটেই অতিক্রম করা সম্ভব হবে।

মাছ ব্যবসায়ী মহিদুল ইসলাম বলেন, একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিনই আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মাছ দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে না পারলে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন সহজ হবে, তেমনি মানুষের দুর্ভোগও অনেক কমে যাবে।

বারইপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, একটি সেতুর জন্য আমরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি। খেয়া পার হয়ে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও বাজারে যেতে হয়েছে। এখন কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় মনে হচ্ছে আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুটি চালু হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে এবং মানুষের সময় ও পরিবহন ব্যয় অনেক কমে যাবে। এই সেতু কালিয়ার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ খান লিটন বলেন, সেতুর মূল স্ট্রাকচারাল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন শেষ পর্যায়ের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ করে সেতুটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।

নড়াইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, মূল স্ট্রাকচারাল কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। স্টিল স্ট্রাকচারের কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি আগামী দুই মাসের মধ্যে সেতুটি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত হবে। উদ্বোধনের পরই যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন