খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গবেষণা

বন্যপ্রাণীর রোগ : বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন সংকেত

নিজস্ব প্রতি‌বেদক

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার ফলে দেশে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘নীরব হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল ও চিড়িয়াখানাগুলোতে বন্যপ্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রোগগুলো দ্রুত গবাদি পশু এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতে রয়েছে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ্ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডাঃ মোঃ সালাউদ্দীন গবেষণাটি সম্পন্ন করেন। গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘আইজেআইডি ওয়ান হেলথ্’ এ প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের আগস্টে রংপুরে গবাদি পশুর মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে প্রায় ২০০ মানুষ আক্রান্ত হন এবং দুইজন মারা যান। গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত পশুর মাংস বা হাড় খেয়ে বন্য কুকুর, শিয়াল এবং চিল এই জীবাণু বনের গভীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

একইভাবে, গবাদিপশুর যক্ষ্মা এখন বন্যপ্রাণীর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ২০১৭ সালে একটি দুগ্ধ খামারে যক্ষ্মায় আক্রান্ত ১৮টি গরু শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি দুটি রেসাস বানরের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা গবাদিপশু থেকে বন্যপ্রাণীতে সংক্রমণের শক্ত প্রমাণ দেয়। এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজীপুর সাফারি পার্কের শেষ স্ত্রী জিরাফটিও যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এছাড়া অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত বা সংক্রমিত কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক এবং ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস বাঘ ও অন্যান্য বন্য প্রাণীর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে বন বিভাগ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা করলেও সেখানে পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসক (ভেটেরিনারিয়ান) নেই। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর শুধু গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে অধিক কাজ করে এবং জনস্বাস্থ্য বিভাগ কেবল মানুষের রোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

ডাঃ মোঃ সালাউদ্দীন বলেন, বন্যপ্রাণীর রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরি বা কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ বাংলাদেশে নেই। এ অবস্থায় এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ‘ওয়ান হেলথ’ ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর করা জরুরী। তিনি স্বল্পমেয়াদী তিনটি পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।

এর মধ্যে রয়েছে বন বিভাগে জরুরি ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত বন্যপ্রাণী বিষয়ক পশুচিকিৎসক (ভেটেরিনারিয়ান) নিয়োগ করা, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা – যেখানে মানুষ, গবাদি পশু ও বন্যপ্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শ ঘটে, সেখানে নিয়মিত নজরদারি বা ‘সেন্টিনেল সার্ভেইল্যান্স’ চালু করা এবং স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে সুন্দরবন ও জনবসতির মাঝে একটি বাফার জোন বা সুরক্ষিত অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

গবেষক ডাঃ মোঃ সালাউদ্দীন বলেন, রংপুরের অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ বা সাফারি পার্কের জিরাফের মৃত্যু একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা এখন আর কেবল সংরক্ষণের বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আগামীর অতিমারি প্রতিরোধের জন্য এক অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন