বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এখন ত্রিমুখী সংকটে জর্জরিত। বন রক্ষা করার মতো নেই পর্যাপ্ত জনবল, অন্যদিকে আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘দাদন’ প্রথা বা মহাজনদের ঋণের জাল, যা সাধারণ জেলেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে। এই তিন সংকটের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ এখন হুমকির মুখে।
বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিচ্ছে। গ্রেপ্তারের পরও অনেকেই স্বল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে খুলনা রেঞ্জসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যু, চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী চক্রের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়োজিত বনরক্ষী ও কর্মকর্তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। খুলনা রেঞ্জে অনুমোদিত ৬৪৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৪২৩ জন বনকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে ২২১টি পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল বনাঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এই বিশাল বন পাহারা দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ টহল ফাঁড়ি ও স্মার্ট প্যাট্রোলিং দরকার, জনবল সংকটের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্টেশনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও আধুনিক নৌযানের অভাব থাকায় বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের দমন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, সুন্দরবনে কীটনাশক দিয়ে মাছ শিকারের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী অর্থলগ্নিকারী ও পাচার সিন্ডিকেট। স্থানীয় প্রভাবশালী মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম দাদন নিয়ে অনেক জেলে ঋণ পরিশোধ ও দ্রুত লাভের আশায় নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করে মাছ ধরতে নদী ও খালে কীটনাশক প্রয়োগ করছে। খালের পানিতে তারা রিপকর্ড, সাইপারমেথ্রিন, ডাইমেক্রন এবং ইনতেফা কোম্পানির ‘শেফা’সহ বিভিন্ন বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা রেঞ্জে ২৯৪টি মামলা দায়ের এবং ৩৯৬ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে অবৈধ প্রবেশের ১০৬টি, বিষ প্রয়োগের ৩৩টি এবং হরিণ শিকারে ৩৩টি মামলা রয়েছে। অভিযানে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, ৬ হাজার ৯৮৬ আটন, ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ২ হাজার ৬১২ কেজি মাছ, ১ হাজার ৯৮১ কেজি কাঁকড়া, ২০৩ কেজি মধু এবং ৮৭ বোতল বিষাক্ত কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ১৩৫ জন চিহ্নিত শিকারির একটি ‘রেড লিস্ট’ তৈরি করে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
কয়রায় স্থায়ী নিরাপত্তা চেকপোস্ট না থাকায় পাচারকারীরা দক্ষিণ বেদকাশী থেকে কাটকাটা হয়ে কয়রা সদর এবং মহেশ্বরীপুর হয়ে দাকোপের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বনজ সম্পদ পাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কয়রা উপজেলা সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি আবু হাসান সরদার বলেন, বন বিভাগের জনবল ও অস্ত্রের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি কয়রার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন, ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রি বন্ধ এবং নেপথ্যের মহাজনদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
আইনগত বিষয় নিয়ে কয়রা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী এ্যাড. মোঃ আবুবকর সিদ্দিক বলেন, বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬(১)(চ) ধারায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অপরাধ জামিন অযোগ্য হলেও মামলার পরিস্থিতি ও বিচারিক বিবেচনায় আদালত জামিন দিতে পারেন। সুন্দরবন রক্ষায় বিদ্যমান বন আইন আরও কঠোর ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, এসব মাছ খেলে তীব্র বমি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ ফুড পয়জনিং হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এ ধরনের মাছ অত্যন্ত বিপজ্জনক।
খুলনা জেলা ডি-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ আমির হামজা বলেন, দক্ষিণ বেদকাশী, কাটকাটা, শাকবাড়িয়া ও আমাদী নৌ পুলিশ ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে পুলিশ আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট পেট্রোলিং ও দুর্গম এলাকায় পায়ে হেঁটে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অভিযান চলাকালে অনেক সময় অস্ত্রধারী অপরাধীদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, ড্রোন প্রযুক্তি ও ফুট পেট্রোলিংয়ের সমন্বয়ে বনাঞ্চলে অপরাধ দমনে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

