জুলাই আন্দোলনে শহিদ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ’১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ-এর দ্বিতীয় শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শনিবার (১৮ জুলাই) খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে বেলা সোয়া ১১ টায় সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে ‘জুলাই বিপ্লব থেকে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাঁদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে আন্দোলনের জন্ম, সেই চেতনা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। দেশে যাতে নতুন করে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠে এজন্য জুলাই সনদ ও হ্যাঁ ভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীর দাবি প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ সময়ের দাবি এবং সেটির নাম শহিদ মীর মুগ্ধ’র নামে করার বিষয়ে তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
কেডিএ চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, মীর মুগ্ধ’র সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত করেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জুলাই শহিদদের অবদান কখনও ভোলা যাবে না।
তিনি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় খুলনার রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক নেতৃবৃন্দের অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের স্বার্থে মৎস্য ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হস্তান্তরের দাবি জানান এবং শহিদ মীর মুগ্ধ’র নামে আবাসিক হল প্রতিষ্ঠার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। একই সাথে শহিদ মীর মুগ্ধ’র নামে মেইন গেটের নামকরণ করায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।
খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে যেমন বিতর্ক রয়েছে, তেমনি জুলাইযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়েও যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মীর মুগ্ধের মতো অনেক দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা ভবিষ্যতে ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মীর মুগ্ধ নিজের জীবন উৎসর্গ করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। পাশাপাশি তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকৃত ইতিহাস নতুনভাবে লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম বলেন, শহিদ মীর মুগ্ধ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে পানি তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ তাঁকে মানবিকতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, জীবনের মহত্ত্বই মানুষকে যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় করে রাখে। মীর মুগ্ধের আত্মত্যাগ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি জুলাই শহিদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।

শহিদ মীর মুগ্ধের পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহিদ সাকিব রায়হানের পিতা শেখ আজিজুর রহমান বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁদের সন্তানদের স্মৃতিচারণ করেন।
সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ হারুনর রশীদ খান, ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোঃ নূরুন্নবী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুস সাদাত। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালক মোঃ মতিউর রহমান এবং কানিজ ফাতিমা খুশি। এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষ্যে বাদ মাগরিব কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
আলোচনা সভায় শিক্ষকদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন গণিত ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ আজমল হুদা। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনুভূতি ব্যক্ত করেন আইন ডিসিপ্লিনের ’১৯ ব্যাচের আল শাহরিয়ার ও গণিত ডিসিপ্লিনের ’২২ ব্যাচের জাহিদুল ইসলাম। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি সংসদ সদস্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে শহিদ মীর মুগ্ধ’র স্নাতক পরীক্ষার সনদ তাঁর পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি শহিদ মীর মুগ্ধ ও শহিদ সাকিব রায়হানের পরিবারকে সম্মাননা জানানো হয় এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদেরও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
আলোচনা সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন জামে মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম ক্বারী মুস্তাকিম বিল্লাহ। এ সময় জুলাই শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায় দোয়া করা হয়।
এর আগে কর্মসূচির শুরুতে সকাল সাড়ে ১০টায় অদম্য বাংলা চত্বরে জুলাই আন্দোলনের স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এসময় অতিথিবৃন্দ প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া স্থিরচিত্র ঘুরে দেখেন। পরে তারা বৃক্ষরোপণ করেন।
এ সকল কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কুলের ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকতা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
খুলনা গেজেট/এএজে

