বৃহস্পতিবার । ১১ই জুন, ২০২৬ । ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

খুলনা ওয়াসার ৯৪ কোটি টাকার চারটি নামবিহীন চেক নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা ওয়াসার একটি ব্যাংক হিসাব থেকে ইস্যু করা ৯৪ কোটি টাকার চারটি নামবিহীন চেককে ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। আলোচনায় এসেছে সংস্থাটির বহুল আলোচিত ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প-২। চেকগুলোতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ও স্বাক্ষর থাকলেও উল্লেখ নেই কোনো গ্রহীতার নাম বা তারিখ। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে খুলনা ওয়াসা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাউথইস্ট ব্যাংক খুলনা শাখায় থাকা খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামের হিসাবের বিপরীতে ইস্যুকৃত চেক বইয়ের চারটি পাতায় দুটি চেকে ২৪ কোটি টাকা করে মোট ৪৮ কোটি এবং অপর দুটি চেকে ২৩ কোটি টাকা করে মোট ৪৬ কোটি টাকা লেখা রয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি চেকের মোট অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি টাকা। চেকগুলোতে রেজাউল ইসলামের স্বাক্ষর থাকলেও কোনো গ্রহীতার নাম কিংবা তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। তবে দুটি চেকের ‘বুঝিয়া পাইলাম’ অংশে ইংরেজিতে ‘নাহিদুল ইসলাম’ নামে একজনের নাম ও স্বাক্ষর দেখা গেছে।

সাউথ ইস্ট ব্যাংক, প্রধান কার্যালয় এর এসএভিপি আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই অ্যাকাউন্ট খুলনা ওয়াসার প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামের। রেজাউল ইসলামের ব্যাংক হিসাবের ৩০,৩৫,৩৭,৩৯ নম্বরের চারটি চেক। এখনই এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলা সম্ভব নয়।

খুলনা ওয়াসার একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প-২-এর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবেই এসব চেক ইস্যুর ঘটনা ঘটে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম।

২০২৫ সালের শেষের দিকে রেজাউলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের উপর সাধারণ কর্মকর্তারা আন্দোলন শুরু করলে সেই আন্দোলন দমাতে রেজাউল আশ্রয় নেয় এনসিপি নেতাদের কাছে। কথিত আছে সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার মাধ্যমে শতকোটি টাকায় তার পদ নিয়ে রফাদফা করে।

২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আলোচিত নেত্রী নুসরাত তাবাসুম নিজে খুলনা এসে রেজাউলের পক্ষে অবস্থান নেয়। ওই সময় স্থানীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে রেজাউলকে নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়।

একপর্যায়ে মব এবং তৎকালীন মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পান রেজাউল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেয়া হয় রেজাউলকে। সূত্র জানায়, ওই সময় প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ ওইসব নেতাদের পাইয়ে দেয়ার শর্তে চারটি চেকের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে দফারফা করেন তিনি।

সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার কয়েকজন রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাকে খুলনায় এনে প্রকল্পের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির ঘটনাও ঘটে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লিগপন্থি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০২০ সালে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে পানি সরবরাহ প্রকল্প-২-এর প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে মোঃ রেজাউল ইসলামের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।

খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফিরোজ শাহ বলেন, চারটি চেকের রহস্য উদঘাটনে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে চেকগুলো কেন ইস্যু করা হয়েছিল, কার জন্য করা হয়েছিল এবং এর পেছনে কোনো আর্থিক অনিয়ম রয়েছে কি না-তা খতিয়ে দেখা হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন