রবিবার । ১০ই মে, ২০২৬ । ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩

পিঠাভোগে রবী ঠাকুরের পূর্বপুরুষের ভিটাবাড়ি

বি.এম শহিদুল ইসলাম

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের ভিটা-বাড়ি রূপসা উপজেলায় ভৈরব নদীর তীরবর্তী ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে অবস্থিত। এই পিঠাভোগের কুশারী বাড়ির সঙ্গে রবী ঠাকুরের পিতৃপুরুষের যোগসূত্র রয়েছে। কুশারীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ। কুশারী বংশ ইংরেজদের আমলে ঠাকুর হয়। বংশ ক্রমে তাদেরকে পীরালী ঠাকুরও বলা হতো। কুশারীদের একাংশ (২৫তম বংশ পুরুষ) এখনও পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছে। বিশ্বকবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পিঠাভোগের কুশারীদের সাথে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করতেন।

রূপসার পিঠাভোগে রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের কারুকার্যময় কুশারী বাড়ির সেই অট্টালিকা ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অক্ষত ছিল। অভাব অনটনের যাতা কলে পিষ্ট হয়ে কবির বর্তমান বংশধরেরা সেই ভবনটি বিক্রি করে দেয়। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে পিঠাভোগে কবির বাস্তুভিটা অনুসন্ধানে পরীক্ষামূলক প্রতœতাত্ত্বিক খননে একটি বিলুপ্ত ইমারতের ভিত নকশা উন্মোচনসহ সেই সময়কালের সাক্ষ্যবাহী বেশ কিছু প্রতœবস্তু ও স্মারক নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ভবনটি সমতল ভূমি থেকে চার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছিল এবং তা নির্মিত ছিল ইন্দোইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর আদলে। ২০১৫ সালে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক কবিগুরুর পূর্বপুরুষের বাস্তুভিটাকে প্রতœতাত্ত্বিক আইনের আওতায় সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়। পিঠাভোগের কুশারী বাড়িতে পুরোপুরি কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রবেশপথের আদলেই তৈরি প্রবেশপথের ওপর লেখা ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ও রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রহশালা’। এটি ১৯৯৪ সালে ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

খুলনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পিঠাভোগের কুশারী বংশের ধারাবাহিকতার একটি অংশই হলো কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। একসময়ের প্রমত্তা ভৈরব নদের তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে (৮ম পুরুষ) রামগোপালের পুত্র জমিদার জগন্নাথ কুশারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃকুলের আদি পুরুষ। জগন্নাথ কুশারীর অধস্তন (১৪তম পুরুষ) পঞ্চানন কুশারী। পারিবারিক মতপার্থক্যের কারণে পিঠাভোগের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ভাইয়ের অনুকূলে হস্তান্তর করে ভাগীরথী (গঙ্গা) নদীর তীরবর্তী কলকাতার সুতানুটির দক্ষিণ দিকের গ্রাম গোবিন্দপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী। তাঁর ভাই প্রিয়নাথ কুশারী পিঠাভোগ গ্রামে থেকে যান।

ওই সময় গোবিন্দপুরে বসবাস করত জেলে, মাঝি, দিনমজুর প্রভৃতি মানুষ। ওই অঞ্চলে কোনো ব্রাহ্মণের বাস ছিল না। পঞ্চানন কুশারী একমাত্র ব্রাহ্মণ ছিলেন। ফলে এ অঞ্চলে লোকজন পঞ্চানন কুশারীকে ভক্তি করে ঠাকুর বলে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কেবল তা–ই নয়, এ সময় ভাগীরথী নদীতে ইংরেজদের বাণিজ্য তরি ভিড়ত। সেই বাণিজ্য তরির মালামাল ওঠানো–নামানোর ঠিকাদারি ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ ব্যাবসা শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী। এ কাজে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা স্থানীয় লোকজনও তাঁকে ঠাকুর বলে ডাকায় জাহাজের কর্মচারীদের কাছেও তিনি ঠাকুর বলে পরিচিত হন। এভাবে একদিন পঞ্চানন কুশারীর উপাধি ঠাকুর ডাকের অন্তরালে হারিয়ে যায় এবং কাগজে-কলমে ঠাকুর উপাধি জারি হয়ে যায় (রবীন্দ্র জীবনী ১ম/পৃ. ৩)। পরে পঞ্চানন কুশারী বা পঞ্চানন ঠাকুরের পৌত্র নীলমণি ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোতে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। নীলমণি ঠাকুরের অধস্তন চতুর্থ প্রজন্ম অর্থাৎ কুশারী বংশের (২০তম) পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আর পিঠা ভোগে থেকে যাওয়া প্রিয়নাথ কুশারীর বংশধর অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের (২৫তম বংশধর) এখনো পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছেন।

দ্বারকানাথ ও দ্বিগম্বরী দেবীর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের বারো বছর বয়সে খুলনা ফুলতলায় দক্ষিণডিহির রামনারায়ণ রায় চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীর সাথে বিয়েতে দেখা হয়। তখন সারদা দেবীর বয়স ছয়-সাত বছর। সারদা দেবীর গর্ভে দেবেন্দ্রনাথের পনেরোটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সারদা দেবীই রবীন্দ্রনাথের জননী। দেবেন্দ্রনাথের পুত্রদের মধ্যে স্বনামে বিখ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথের বাইশ বছর বয়সে বিয়ে হয় দক্ষিণডিহির বেনীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী ওরফে মৃনালিনী দেবীর সাথে। অতএব পূর্বপুরুষ সহ পিতৃকুল মাতৃকুল এবং শ্বশুর কুলের আত্মীয়তার সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সাথে খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বাড়ির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহির রায় চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে রয়েছে শিকড়ের সম্পর্ক।
১৯৫২ সালে কলিকাতার বাঙ্গী নাট্য সংস্থা ‘কুশারী পরিবার নামে’ একটি নাটক মঞ্চস্থ করে। যে নাটকের কাহিনিতে পিঠাভোগের কুশারীদের সমাজ পতন পীরালী শাখা ভুক্ত হওয়া এবং তার পরবর্তী কাহিনি উপস্থাপন করা হয়েছে। কুশারীরাই রবীন্দ্রনাথের আদি পুরুষ এটা তার সাক্ষ্য বহন করে।

রূপসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রিকতা বলেন, “কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে উঁচু মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তিনি শুধু বাঙালি জাতির গর্বই নন, তিনি বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জন্মবার্ষিকী শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পিঠাভোগের এই ঐতিহাসিক স্থানকে কেন্দ্র করে আমরা একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত আয়োজন নিশ্চিত করতে চাই। এজন্য সকলকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এবারও বিশ^ কবির জন্মজয়ন্তীতে পিঠা ভোগে চলছে তিন দিনের নানা আয়োজন।”

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন