সোমবার । ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩

পিতার হাতে স্বপ্নবোনা প্রথম খাল পুনঃখননে যশোরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি সারাদেশের কৃষি সেক্টরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৭৬ সালে সেই কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল যশোর থেকে। শার্শার উলশী যদুনাথপুর খালখনন ছিল প্রথম প্রকল্প। শুধুমাত্র খাল খননে সীমাবদ্ধ ছিলো না সেই কর্মসূচি। রাষ্ট্রপতি জিয়াকে কাছে পেয়ে নতুন স্বপ্নে জেগেছিল যশোরাঞ্চলের মানুষ।

পঞ্চাশ বছর পর আবার সেই খাল পুনঃখনন করতে যশোরে আসছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম পর্বে সাড়া জাগানো সেই প্রকল্পে কী ছিল, তা এ প্রজন্মের কাছে অজানা থাকলেও সে সময়ের মানুষের কাছে ছিল এক গৌরবগাথা। ভালবেসে স্থানীয়রা এটিকে এখনো জিয়া খাল বলে থাকেন।

১৯৭৬ সালে দেশের দায়িত্বভার নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যুদ্ধ ছিল কৃষি সেক্টরে সেচের জন্য পানির যোগান দিয়ে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে জনগণকে সংগঠিত করে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তিনি খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন।

তার ১৯ দফা কর্মসূচির এটা ছিল একটি মূল লক্ষ্য। সেচের জন্য যে তিন ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে তার মধ্যে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচকার্য চালানোর একটি মাধ্যম হচ্ছে খাল। তাই দেশে বিরাজমান খাদ্য সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে সেচের প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করে জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এ কর্মসূচির প্রথম প্রকল্প উলশী-যদুনাথপুর সংযোগ খাল। পরবর্তীতে যা ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারাদেশে।

যশোর জেলা সদর থেকে ৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শার্শা উপজেলার গ্রাম উলশী।

এ গ্রামের উত্তরে বেতনা নদী এবং গিলাপোল গ্রাম, দক্ষিণে যদুনাথপুর, বড়বাড়িয়া এবং সামটা, পূর্বে ঝিকরগাছা, এবং পশ্চিমে কাঠুরিয়া।

খাল খননের উদ্দেশ্য ছিল বেতনা নদীর সঙ্গে উলাশী-যদুনাথপুরের সংযোগ সাধন যাতে বনমান্দার, সোনামুখী, কাগমারী এবং রাজাপুর বিলের জলাবদ্ধতা দূর করা যায়।

এখানে অশ্বখুরাকৃতি বেতনা নদী ১৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে প্রবাহিত হত। উলশীর সঙ্গে খাল কেটে যদুনাথপুরের সংযোগ সাধন করা গেলে এ দূরত্ব প্রায় ১১.৬ কিলোমিটার কমে যাবে।

১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল খনন শেষে প্রেসিডেন্ট জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে খাল উদ্বোধন করেন এবং ১৯৭৯ সালের জুন মাসে সারথী প্রকল্পের কাজ শেষ হয়।

যশোরের শার্শা উপজেলার উলশীতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকলেই চোখে পড়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। খালের পাড়ে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকা ফলকে খোদাই করা আছে, ‘আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার আমাদের দেশ গড়বার।’ আর লেখা আছে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের কথা-উলশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প।

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ফলকের অপর পাশে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকল্প শেষে তিনি আবারও এখানে আসেন। ইতিহাস বলছে, ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাটি কেটে যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলশী-যদুনাথপুরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

মূলত উলাশী গ্রাম থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বেতনা নদীটি সর্পিলাকার ও ঘোড়ার খুরের মতো। এর দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার। কিন্তু আড়াআড়ি খাল খনন করা হলে সেটির দৈর্ঘ্য হবে ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু শ্রমজীবী নন, সব শ্রেণির মানুষ এ খনন কাজে অংশ নেন। খালটি কেবল পানি চলাচলের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার। স্থানীয় জেলে ও ভূমিহীন কৃষকরা এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। উদ্বোধনের ৬ মাস পর ফের উলাশীতে যান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

খাল খনন করায় বর্ষা মৌসুমে শার্শার পাঁচটি বিলের পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়। বিল এলাকার জমি আসে আবাদের আওতায়। একই সঙ্গে সেচপাম্প বসিয়ে খালের পানি ব্যবহার করা হয়। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। সেদিন উলশীকে স্বেচ্ছাশ্রম ও গণজাগরণের এক অভূতপূর্ব প্রতীক হিসাবে দেখিয়ে দেশের প্রতিটি থানায় উলশী অনুসরণে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।

জিয়ার মৃত্যুর পর এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে শিথিলতা আসে এবং পরবর্তী সরকার জিয়া প্রবর্তিত প্রায় সবকটি কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত করে দেয়।

খালকাটায় অংশ নেওয়া উলশী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মাওলা বক্স বলেন, ‘উলশীতে খাল খননের পর ওই পাঁচটি বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ শুরু হয়। এ অঞ্চলে ইরি (বোরো) ধানের চাষের প্রচলন ঘটে। খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ায় এলাকাটি ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথ ধরে তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উলশীতে আসছেন সেই খাল আবার কাটতে। তার আগমনে এলাকাবাসীর মাঝে দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্যতা।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ‘উলশী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল পুনঃখনন কমসূচির উদ্বোধন করবেন। আশা করছি মৃত প্রায় খালটি প্রাণ ফিরে পাবে। আবারো সেচ সুবিধার আওতায় আসবে খালপাড়ের কৃষি জমিগুলো।’

যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘দীর্ঘ ৫০ বছরে উলশী-যদুনাথপুর খাল সংস্কার না করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সেই খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৫০ বছর আগে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজে হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা সেই খালটি পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে আসছেন তার সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কাজের জন্য ইতিমধ্যে আমরা সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।’




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন