বাগেরহাটের মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিডগানে ধরা পড়ল বেপরোয়া গতি; আইন মানাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের ঢলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মহাসড়কগুলো হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। বাগেরহাটের ফকিরহাট ও মোল্লাহাটসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করে দ্বিগুণ গতিতে ছুটছে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। ফলে নিরাপদ ঈদযাত্রা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
গতকাল বুধবার ও গত পরশু দু’দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, কাটাখালী হাইওয়ে থানাধীন বেইলি ব্রিজ এলাকা এবং মোল্লাহাট হাইওয়ে থানাধীন সাগর ফিলিং স্টেশনের সামনে স্পিডগান দিয়ে গতি পরিমাপে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গাড়ির গতি ছিল ঘণ্টায় ৭৫ থেকে ৮৫ কিলোমিটার। অথচ দুর্ঘটনাপ্রবণ এসব বাঁকে সর্বোচ্চ অনুমোদিত গতিসীমা ৪০ কিলোমিটার।
শুধু এই দু’টি স্থান নয়, ঢাকা-খুলনা, খুলনা-মোংলা ও খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের ফকিরহাট, মোল্লাহাট, কাটাখালী, শ্যামবাগাতসহ অন্তত ১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পটে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বাস, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার এমনকি মোটরসাইকেলও চলছে বেপরোয়া গতিতে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি যানবাহনও এই নিয়ম মানছে না।
গতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও কাঙ্খিত ফল মিলছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, চালকদের একটি অংশ গতি কমাতে অনীহা দেখান; কখনো যাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে তারা পুলিশের সঙ্গে তর্কেও জড়ান। মামলা দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চেকপোস্টের সামনে কিছুটা ধীরগতিতে চললেও কিছুদূর এগিয়েই আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠে যানবাহন। যাত্রীদের চাপ ও বাড়তি ট্রিপের লোভে চালকরা নিয়মিত ট্রাফিক আইন অমান্য করছেন। অনেক গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে, যা এসব বাঁকযুক্ত সড়কে ছোট যানবাহনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে ফকিরহাট ও মোল্লাহাট হাইওয়ে থানায় ১৭টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১২ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ৩৫টি দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে, আহত হন ১০৭ জন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই ১৩টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও অন্তত ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, মামলা না করার প্রবণতার কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সর্বশেষ গত ১২ মার্চ কাটাখালী হাইওয়ে থানাধীন খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেইলি ব্রিজ এলাকায় বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। প্রাথমিক তদন্তে অতিরিক্ত গতিকেই এ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
মোল্লাহাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ‘ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। একই সড়কে ধীর ও দ্রুতগতির যান চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি এবং চালক-যাত্রীদের সচেতন করছি।’
বাগেরহাট নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর সভাপতি আলী আকবর টুটুল বলেন, ‘শুধু অভিযান নয়, প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ, কঠোর নজরদারি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিবহন মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ঈদযাত্রায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’
খুলনা গেজেট/এনএম

