সুন্দরবনের নদী ও খালের পাড়ে এখন চলছে মৃত্যুর উৎসব। ফসলের খেতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কৃষি কীটনাশক এখন নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে বনের গহিনে। সুন্দরবনের আশপাশের লোকালয়ে জেলে ও দাদনদারদের সাথে কৃষি কীটনাশক বিক্রেতাদের রমরমা ব্যাবসা চলছে। ফসলের খেতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত এসব বিষ এখন নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে সুন্দরবনের নদী, খাল ও বিলে। রিপকার্ড, রোটেনন, কার্বোফুরানসহ নানা ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করে ধরা হচ্ছে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। এতে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় স্বীকৃত ডিলারের পাশাপাশি বিভিন্ন সাধারণ দোকান ও গোপন গুদামে নিষিদ্ধ ও অতিমাত্রার কীটনাশক মজুত রাখা হচ্ছে। অনেকেই বাড়িতে বিষ রেখে অর্ডার অনুযায়ী জেলেদের কাছে সরবরাহ করছে। আবার সুন্দরবনে মাছ শিকারের জন্য উচ্চমাত্রার বিষ ভারত থেকে চোরাই পথে আনছে একটি চক্র। এসব কিনতে কোনো কৃষি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্বিঘ্নে বিষ সরবরাহ ও ব্যবহার করছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের সুপতি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ লিটার সাইপারমেথ্রিন ১০% বিষ জব্দ করেছে বন বিভাগ। গত এক বছরে দেড় হাজার কেজির বেশি মাছ জব্দ করেছে তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক কেজি উচ্চমাত্রার কীটনাশক কয়েক কিলোমিটার খালের জলজ প্রাণী ধ্বংস করতে পারে এবং জলাবদ্ধ স্থানে এর প্রভাব এক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
পূর্ব বন বিভাগ গত তিন মাসে ১৭৯ টি অভিযানে ১৪৮ জনকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও হরিণ শিকারের অপরাধে সুন্দরবন থেকে গ্রেপ্তার করেছে। বিপুল পরিমাণ মাছ মারার বিষ, চারু, বিষ দিয়ে ধরা মাছ, হরিণ ধরার ফাঁদ ও হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে নজরদারিতে রাখা হলেও থামানো যাচ্ছে না এ সংক্রান্ত অপরাধ। এছাড়া সুন্দরবনের বেশ কয়েকটি বনদস্যু দলের প্রত্যক্ষ মদদে এসব অপরাধ হচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন বিষ বিক্রির তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা না রাখায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ফসলের জমির তুলনায় কীটনাশক বিক্রির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলেও তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বনের পাশে থাকা মাছের ডিপোগুলোয় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে অনেকে ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। ডিপো মালিক ও দাদনদারেরা অল্প সময়ে বেশি মাছ সংগ্রহ করার জন্য জেলেদের বিষ প্রয়োগে সহযোগিতা করে থাকেন বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা। বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল উপজেলার বন সংলগ্ন এলাকা ঘুরে একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাচ্ছে বন বিভাগ। গত কয়েক মাসে পূর্ব সুন্দরবনে অভিযানে বিপুল পরিমাণ কীটনাশক, বিষযুক্ত মাছ, নৌকা ও জাল জব্দ করা হয়েছে এবং বহু জেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, লোকালয়ে কীটনাশক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এক্তিয়ার তাদের নেই। ফলে উৎসস্থলে বিষ বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বন বিভাগ জানায়, বনসংলগ্ন এলাকায় কৃষি বিষ বিক্রি মনিটরিংয়ের বিষয়টি লিখিতভাবে বাগেরহাট জেলা কৃষি অফিসকে একাধিকবার জানানো হলেও দীর্ঘদিনেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এতে বন বিভাগের অভিযান একদিকে চললেও অন্যদিকে বিষের সরবরাহ অব্যাহত থাকছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিষ প্রয়োগ বন্ধ না হলে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। একই সঙ্গে বাজারে পৌঁছানো এসব মাছ মানুষের শরীরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ মোতাহার হোসেন বলেন, “বনে কৃষি বিষ গেলে এর দায় আমার একার নয়। এখানে বনবিভাগ, মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “অসাধু জেলেদের বিষ প্রয়োগ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি বড় হুমকি। বনবিভাগ এসব অপরাধীদের ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করছে। বন বিভাগের একার পক্ষে এটি নির্মূল করা কঠিন। কেননা সুন্দরবনে ঢোকার অগণিত প্রবেশ খাল রয়েছে এবং বিষদস্যুরা মধ্য রাতে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনে প্রবেশ করে। এটি প্রতিরোধে এখন সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। বিষের উৎস নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমরা কৃষি বিভাগকে চিঠি দিয়েছি এবং জেলা সমন্বয় সভায়ও বিষয়টি একাধিকবার উত্থাপন করেছি। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও লক্ষ্য করা যায়নি।’
খুলনা গেজেট/এনএম

