মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও আপিল শেষে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনে ২৮ জন প্রার্থী রয়েছেন। সচেতন ভোটারদের ধারণা প্রতিটি আসনেই বিএনপির সাথে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের লড়াই হবে। তবে বিএনপি প্রার্থীদের গলার কাঁটা এখন নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। পাশাপাশি দু’টি আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
বাগেরহাট-১ : চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-১ আসন। এ আসনে বিএনপির অর্ধ ডজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও শেষ পর্যন্ত চিতলমারীর কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মন্ডলকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আছেন তিনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মাসুদ রানা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় অনেক নেতাকর্মীরা তাদের পক্ষে কাজ করছেন।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রয়েছেন অধ্যক্ষ মোঃ মশিউর রহমান খান। সাধারণ মানুষের ধারণা স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকলে বিএনপির প্রার্থী অনেকটা চ্যালেঞ্জে পড়বেন।
এছাড়া এ আসনে নির্বাচন করছেন, মুসলিম লীগের প্রার্থী আবু সবুর শেখ, এবি পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি-জেপি’র স, ম, গোলাম সরোয়ার। এ আসনে খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক প্রার্থী থাকলেও শেষ দিকে প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছেন জোটের নেতৃবৃন্দ।
স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মাসুদ রানা বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আমি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। গণমানুষের চাওয়ার জন্যেই প্রার্থী হয়েছি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকব। মাঠ পর্যায়ে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের সকল নেতাকর্মী আমার সাথে রয়েছে। আমরা তারেক রহমানকে এই আসন উপহার দিতে পারব।
এ আসনে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬০ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৮ জন পুরুষ, ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭২০ নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের দু’জন ভোটার রয়েছেন।
বাগেরহাট-২ : বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট পৌরসভা ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-২ আসন। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। এরপর থেকেই তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিদের সাথে ঘরোয়া বৈঠক ও আলোচনা শুরু করেছেন। সভা-সমাবেশেও যোগ দিচ্ছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সাবেক দুই সভাপতি। এরা হলেন, সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম ও এম এ সালাম। তবে দলীয় বিবেচনায় মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেন বলে জানিয়েছেন এমএ সালাম।
এম এ এইচ সেলিম বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এ আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলাম। তখন জেলার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। তাই আমি তিনটি আসনেই নির্বাচন করছি।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বয়সে তরুণ হলেও, ভোটের মাঠে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছেন। সরকারি পিসি কলেজের সাবেক এজিএস থেকে শুরু করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং ফ্যাসিস্ট সরকার পতন আন্দোলনে সম্মুখভাগে থাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বিএনপি সুসংগঠিত দল। দলের সকল নেতাকর্মীরা তার সাথে আছেন। শেষ পর্যন্ত জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সমন্বয়ক এম এ সালামসহ দলীয় সকল নেতাকর্মীরা তার সাথে কাজ করবেন।
দুই উপজেলা ও এক পৌরসভায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন পুরুষ, ১ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ৫ জন।
বাগেরহাট-৩ : রামপাল, মোংলা উপজেলা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৩ আসন। অন্যান্য আসনের মত এ আসনে, বিএনপি, স্বতন্ত্র, জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রার্থী রয়েছেন। তবে জেলার একমাত্র এ আসনে এনসিপি প্রার্থী দিয়েছেন।
এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ শেখের সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছেন। যার ফলে এলাকার ভোটারদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীও দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকায়, তারও জনপ্রিয়তা কম নয়। তবে বিএনপি প্রার্থীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএএইচ সেলিম।
সম্প্রতি মোংলা হ্যালিপ্যাডে তার তত্ত্বাবধায়নে বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিলে হামলার ঘটনায় নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি।
এর বাইরে এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী শেখ জিল্লুর রহমান, এনসিপির মোল্লা রহমাতুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এর প্রার্থী মোঃ জুলফিকার হোসেন, জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল (জেএসডি-রব) এর প্রার্থী মোঃ হাবিবুর রহমান মাস্টার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে জোটের কারণে এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামীর যে-কোনো একজন প্রার্থী প্রত্যাহার করতে পারেন।
এ আসনে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৪ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫০ এবং নারী ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫১০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন ভোটার রয়েছে।
বাগেরহাট-৪ : মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা উপজেলা ও মোরেলগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৪ আসন। অবকাঠামো, শিক্ষা ও উন্নয়নের দিক থেকে এলাকাটি পিছিয়ে থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে ভোটাররা অনেক সচেতন। বিগত দিনগুলোতে এখানে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি সোমনাথ দে। তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে জেলা বিএনপি নেতা কাজী খায়রুজ্জামান শিপন।
তিনি বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট বিরোধী সকল আন্দোলনে নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশগ্রহণ করি। জামায়াতে ইসলামী থেকে এই আসনে নির্বাচন করছেন সাবেক ছাত্র নেতা অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা ও এলাকায় জনসংযোগ করে আসছেন।
বিএনপি প্রার্থী সোমনাথ দে’র দাবি দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী তার সাথে আছেন। হিন্দু ধর্মীয় নেতা হওয়ায় সনাতনদের ভোট একভাবে ভাবে পাবেন। সেই সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রচেষ্টায় এবার এই আসনটিকে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারবেন।
জামায়াতের প্রার্থী আব্দুর আলিম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন মানুষের পাশে আছি। বিগত সময়গুলোর থেকে দল এবং সংগঠন আরও বেশি সক্রিয়। সে হিসেবে এবার আমাদের জয় হবে ইনশাআল্লাহ।
বিএনপি জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মোঃ ওমর ফারুক, জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাজন কুমার মিস্ত্রি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী মোঃ আব্দুল লতিফ খান নির্বাচন করছেন।
এ আসনে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৭৮ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯১ হাজার ৮১২ জন পুরুষ, ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৬৩ জন নারী ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

