ভোর হতে না হতেই ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা মৎস্য বাজারে শুরু হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর নিলামের শব্দে প্রতিদিন মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম এই সাদা মাছ ও চিংড়ির পাইকারি বাজারে এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকার মাছ কেনা-বেচা হচ্ছে। বছরের ভরা মৌসুমে এই অঙ্ক দৈনিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়, সেই হিসেবে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ কোটি টাকা।
স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে মাছের সিজন শেষের দিকে হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম। তবুও বাগেরহাট ও খুলনার বিভিন্ন মৎস্য ঘের থেকে প্রতিদিন কয়েকশ মণ সাদা মাছ ও চিংড়ি আসছে এই হাটে। ভোর ৬টা থেকে পিকআপ, নসিমন ও ট্রাকে করে মাছ আসতে শুরু করে এবং সূর্য ওঠার সাথে সাথেই বাজার পুরোদমে জমে ওঠে। চলে বেলা ১২টা পর্যন্ত, তবে বিকেলের আগেই বাজারের সকল কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই বাজারকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে মাছ লোড-আনলোড করা কুলি, প্যাকিং শ্রমিক এবং পরিবহন শ্রমিকদের সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে মাছের গ্রেডিং বা বাছাই করার কাজে স্থানীয় নারী শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন, যারা দৈনিক ৫শ’ থেকে ৭০০ টাকা আয় করে পরিবারে সচ্ছলতা আনছেন। বাজারের চাহিদাকে কেন্দ্র করে আশেপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বড় বরফ কল। মাছ সতেজ রাখতে প্রতিদিন এখানে কয়েক হাজার ক্যান বরফ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কোটি কোটি টাকা লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশেপাশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখা-উপশাখা এবং সার্বক্ষণিক মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা রয়েছে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ফলতিতা বাজারের গুরুত্ব ও পরিধি বহুগুণ বেড়েছে। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় আগে যেখানে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে ১২-১৫ ঘণ্টা লাগত, এখন মাত্র ৫-৬ ঘণ্টায় সেখানকার বাজারে টাটকা মাছ পৌঁছে যাচ্ছে। এখান থেকে সংগৃহীত গলদা ও বাগদা চিংড়ি সরাসরি খুলনা ও চট্টগ্রামের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও জাপানে রপ্তানি হচ্ছে। আড়তদার আকাশ বিশ্বাস জানান, বর্তমানে বড় সাইজের রুই ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা মণ এবং মাঝারি রুই ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়ার মণ বিক্রি হচ্ছে ৪৮০০ থেকে ৫২০০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, মানভেদে গলদা চিংড়ি কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে নিলাম হচ্ছে।
চাষি সুমন বিশ্বাস জানান, “এখানে দ্রুত মাছ বিক্রি ও নগদ টাকা পাওয়ার সুবিধা থাকলেও খাবারের দাম বাড়ায় লাভের হার কিছুটা কমেছে। ৩-৪ কেজি ওজনের কার্প প্রতি মণ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করলেও কোনোমতে আসল টাকা উঠে আসছে। তবে চিংড়ি চাষে রোগবালাই না থাকলে ভালো লাভের আশা করা যায়।
এদিকে, ব্যবসায়ী ও চাষিদের দীর্ঘদিনের দাবি এখানে একটি আধুনিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা। এটি সম্ভব হলে সরবরাহ বেড়ে গেলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাছ সংরক্ষণ করা সহজ হতো এবং চাষিদের লোকসানের ঝুঁকি কমত। পরিশেষে বলা যায়, ফলতিতা মৎস্য আড়ত কেবল একটি বাজার নয়, বরং এটি দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতির এক মজবুত স্তম্ভ। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারটি ভবিষ্যতে দেশের মৎস্য খাতে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
খুলনা গেজেট/এইচ

