বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

ক্ষিরাই চাষে নীরব বিপ্লব

সাগর মল্লিক, ফকিরহাট

মাঠের পর মাঠ জুড়ে বিছিয়ে আছে সবুজের গালিচা। লতার ভাঁজে ভাঁজে ঝুলছে সতেজ ক্ষিরাই। শীতের সকালে সেই ক্ষিরাই সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় চলতি মৌসুমে ক্ষিরাইয়ের বাম্পার ফলন ও সরকারি সহায়তায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। অনুকূল আবহাওয়া আর আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয়ে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে ক্ষিরাই আবাদ হয়েছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফকিরহাটে ক্ষিরাই আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ হেক্টর। কিন্তু ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে চাহিদা থাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে মোট ৪০ হেক্টর জমিতে ক্ষিরাইয়ের আবাদ হয়েছে। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ক্ষিরাই চাষ হচ্ছে।

কৃষকদের এই সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের কৃষি প্রণোদনা। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ১০০ জন প্রান্তিক কৃষককে এই প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এসব কৃষকের প্রত্যেককে বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ এবং ২০ কেজি করে সার প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি পটাশ। এই সহায়তার ফলে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক বিনাপুঁজিতে চাষাবাদ শুরু করে এখন বড় লাভের মুখ দেখছেন।

মাঠ পর্যায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র বীজ আর সার দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি স্থানীয় কৃষি বিভাগ। প্রতিটি ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছেন এবং ফসলের রোগবালাই দমনে কৃষকদের সরাসরি পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়া কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে ‘কৃষক চাহিদা নির্ভর প্রশিক্ষণ’। এর ফলে কৃষকরা এখন সনাতন পদ্ধতির বাইরে এসে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ করতে পারছেন।

ফকিরহাটের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবরটি এসেছে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে। ক্ষিরাই পচনশীল ফসল হওয়ায় এতদিন কৃষকরা ভরা মৌসুমে পানির দরে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু কৃষকদের সেই আক্ষেপ দূর করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অর্থায়নে চলতি অর্থ বছরেই বাগেরহাট সদর ও ফকিরহাট উপজেলার সীমানা সংলগ্ন সিএন্ডবি বাজার এলাকায় একটি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা সবজি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন খুলনা গেজেট কে বলেন, “আমরা এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ নিশ্চিত করতে পেরেছি। ১০০ জন কৃষককে সরাসরি সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সিএন্ডবি বাজার সংলগ্ন এলাকায় সবজি সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজটি নির্মিত হওয়ায় কৃষকরা এখন তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন। এটি এই অঞ্চলের সবজি চাষিদের ভাগ্য বদলে দেবে।”

স্থানীয় কৃষকরা জানান, “সরকারি সার ও বীজ পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক কমেছে। এখন এলাকায় কোল্ড স্টোরেজ হওয়ার কারণে তারা আর লোকসানের ভয় পাচ্ছেন না। ফকিরহাটের এই ‘সবুজ সোনা’ এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাকযোগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে পৌঁছে যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক বাজারজাতকরণ সুবিধা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ফকিরহাট দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারী হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন