বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

দেড় দশক ফাইলবন্দি ভাসমান হাসপাতাল

মোঃ সাগর মল্লিক

সুন্দরবন আমাদের গর্ব, আমাদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ। কিন্তু এই বনের বুক চিরে যারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, সেই লক্ষাধিক বনজীবীর জীবনের মূল্য আজ বনের নোনা জলের চেয়েও সস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলে, বাওয়ালি আর মৌয়ালদের হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে আসা কোটি কোটি টাকার রাজস্বে রাষ্ট্রের কোষাগার সমৃদ্ধ হলেও, আজও পর্যন্ত গহিন অরণ্যের এই বিশাল জনপদের জন্য গড়ে ওঠেনি একটিও স্থায়ী হাসপাতাল।

দীর্ঘ ১৫ বছর আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের দুই বিভাগের জন্য দুটি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রস্তাব আজও ফাইলবন্দি হয়েই পড়ে আছে। বনের গহিনে বাঘের থাবা, কুমিরের কামড় কিংবা বিষধর সাপের দংশনে যখন কেউ রক্তাক্ত হন, তখন তাঁকে লোকালয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসতে ট্রলার বা নৌকায় সময় লাগে অন্তত ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা। মোংলা থেকে ৯০ কিলোমিটার এবং শরণখোলা থেকে ৭০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ রক্তক্ষরণ আর অসহ্য যন্ত্রণার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময়ই জেলের নিথর দেহটি হাসপাতালের ঘাট দেখার আগেই নৌকার পাটাতনে লুটিয়ে পড়ে। চিকিৎসার অভাবে পথেই জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার এই করুণ দৃশ্য সুন্দরবনের বাঁকে বাঁকে মিশে আছে। সাপে কাটা রোগীদের ক্ষেত্রে ট্র্যাজেডি আরও ভয়াবহ; যদি কেউ অলৌকিকভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ছোট হাসপাতালে পৌঁছানও, সেখানে প্রয়োজনীয় ‘অ্যান্টিভ্যানম’ না থাকায় আবারও তাঁদের ছুটতে হয় আরও ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরের জেলা সদর হাসপাতালে।

মেহের আলীর চর, আলোর কোল, অফিস কিল্লা, মাঝের কিল্লা, শেলার চর, নারকেলবাড়িয়া, আমবাড়িয়া, মানিকখালী ও কোকিলমনির মতো দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে ৫-৬টি ওষুধের দোকান থাকলেও সেখানে নেই কোনো চিকিৎসক; ফলে গুরুতর কিছু ঘটলে সেরেফ আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

শুধু সাধারণ বনজীবী নয়, সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীরাও একই ভয়াবহ সংকটে ভুগছেন। পূর্ব বন বিভাগের আওতায় থাকা দুটি রেঞ্জের ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমি সুরক্ষায় ৩১টি ইউনিট অফিসে কর্মরত বনরক্ষীরাও চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।

করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, “বাঘ, কুমির ও বিষাক্ত সাপের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। কেউ আহত হলে লোকালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে; একটি রেসকিউ বোট বা ভাসমান হাসপাতাল থাকলে আজ এই হাহাকার থাকত না।”

শরণখোলা ফরেস্ট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেবের মতে, বৈরী আবহাওয়া আর দুর্গম এলাকায় অসুস্থদের উদ্ধার করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। যদিও পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের অর্থায়নে দুটি ভাসমান হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা আছে, কিন্তু গত ১৫ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা বনজীবীদের মনে কোনো স্বস্তি দিচ্ছে না।

সুন্দরবনের আকাশ রক্তিম করে দিন শেষে সূর্য ডোবে, কিন্তু সেই অন্ধকারের চেয়েও গভীর অন্ধকার নেমে আসে সেইসব পরিবারে, যারা তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছে সেরেফ একটু সুচিকিৎসার অভাবে। বনের গহিনে নৌকার তক্তায় শুয়ে থাকা কোনো মুমূর্ষু মৌয়াল যখন শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকায়, তার ঝাপসা চোখে হয়তো নিজের ছোট ছোট সন্তানদের মুখ ভেসে ওঠে। সে হয়তো একবার হাত বাড়িয়ে কাউকে ডাকতে চায়, কিন্তু তার সেই কণ্ঠস্বর বনের লতাগুল্ম আর নোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে হারিয়ে যায়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন