সোমবার । ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২
জীর্ণ-পরিত্যক্ত ভবন ও শিক্ষক স্বল্পতায় ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম

সংকটে সরকারি পিসি কলেজ

নিজস্ব প্রতি‌বেদক

দক্ষিণাঞ্চলের আলোর বাতিঘর বাগেরহাট সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ। একশ বছর ধরে জ্ঞানচর্চার যে দীপ জ্বলে আসছে, তা আজ নানামুখী সংকটে ক্ষয়ে যাচ্ছে। জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষক সংকট, অনুন্নত অবকাঠামো, বিভাগ ও আবাসনের সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এখন এক গভীর সংকটে।

কলেজ সূত্র জানা যায়, ১৯১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু তাদের পাঠদানের জন্য ৬৮টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের মধ্যে ৩৩টি পদ এখনো শূন্য পড়ে আছে। বর্তমানে কলেজে প্রভাষক পদ রয়েছে ৩৪টি, যার মধ্যে ১৩টি শূন্য। সহকারী অধ্যাপকের ১৭টি পদের মধ্যে ৯টি শূন্য রয়েছে। উপাধ্যক্ষ ও বাংলা বিভাগীয় প্রধানের পদ খালি পড়ে আছে।

বর্তমানে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অবকাঠামোগত সংকট আরও ভয়াবহ। কলেজের পাঁচটি ভবনের মধ্যে দুটি ইতোমধ্যেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ৮৪টি শ্রেণিকক্ষের বিপরীতে চালু আছে মাত্র ৪৮টি, সেগুলোর বেশিরভাগই ভগ্নদশায়। নেই আধুনিক অডিটোরিয়াম, নেই সেমিনার হল। বিভাগীয় ১১টি কক্ষের ৫টিই নাজুক অবস্থায়। সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য বিএনসিসি, রেডক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের আলাদা ভবন না থাকায় তাদের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত।

এছাড়া বাথরুমে পানি নেই, দরজা ভাঙা, ভেতরে দুর্গন্ধ। এমন বাথরুমে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ে বিভাগীয় সংকটও তীব্র। যেখানে প্রতি বিভাগে ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে কোনো কোনো বিভাগে আছে মাত্র একজন। ফলে একজন শিক্ষককে একাধিক কোর্স, অতিরিক্ত ক্লাস এবং বিভাগের দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত ১১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি ৪৫ সিটের বাস।

কলেজটির প্রাণী বিদ্যা বিভাগের ছাত্রী নুসরাত বলেন, “পরিত্যক্ত ভবন দেখে ভয় লাগে। কিন্তু নতুন ক্লাসরুমের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানেই বাধ্য হয়ে পড়তে হয়। যে কারণে নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময়ই চিন্তায় থাকি।”

অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অয়ন শেখ বলেন, “বাথরুম সংকট আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ। ছেলেদের বাথরুমে পর্যাপ্ত পানি থাকে না, টয়লেট ভাঙা, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না।”

কলেজটির বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাপশ কুমার চন্দ্র ঘরামি বলেন, “হল সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীর থাকার জায়গা নেই। থাকার ব্যবস্থা সমাধান হলে শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগী হতে পারবে। এত বড় একটি কলেজ পুরানো জনবল কাঠামো ও ভগ্নদশা ভবন দিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”

ব্যবস্তাপনা বিভাগ বিভাগীয় প্রধান সরদার রইস উদ্দিন বলেন, “আমার বিভাগে শিক্ষার্থী আছে, ক্লাস আছে কিš শিক্ষক নেই। ব্যবস্থাপনা বিভাগের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমরা সবচেয়ে বেশি সংকটে।”

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ জিয়াউল ইসলাম বলেন, “শিক্ষক স্বল্পতা, বাথরুম সংকটসহ সব সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। এত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুরোনো সুবিধা দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। শতবর্ষের গৌরব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারি পিসি কলেজ আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন