স্থানীয় কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন ও গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তর

মোঃ মামুন হাসান

পর্যটন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় হোটেল, রিসোর্ট আর বহুজাতিক ট্যুর কোম্পানির ছবি। অথচ পর্যটনের প্রকৃত সুফল যদি কোথাও সবচেয়ে বেশি পৌঁছাতে পারে, তা হলো গ্রামীণ জনপদ। স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন এমন এক মডেল, যেখানে পর্যটকের খরচ করা টাকা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় জমা না হয়ে সরাসরি চলে যায় সেই গ্রামের মানুষের হাতে, যাদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তা দেখতেই পর্যটক ছুটে আসেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে এই মডেল কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আজকের আলোচনা সেই বিষয়েই।

আশার কথা হলো, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন নিয়ে বাংলাদেশে নীতিগত কাঠামো একেবারে অনুপস্থিত নয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ২০২১ সালে পর্যটন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে, যা এই খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বিন্দু। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন, এথনিক ট্যুরিজম এবং টেকসই পর্যটনের বিকাশে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পর্যটন সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত একটি নৃতাত্ত্বিক উৎসবে খাসিয়া, মণিপুরি, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, ওরাঁওসহ সাতাশটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কমিউনিটি পর্যটনের জন্য কতটা উর্বর ক্ষেত্র। নীতিমালা থাকা ইতিবাচক, তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই গাইডলাইন কতটা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সাধারণ পর্যটন ব্যবস্থায় একজন পর্যটকের খরচ করা অর্থের বড় অংশ চলে যায় শহরকেন্দ্রিক হোটেল চেইন, পরিবহন কোম্পানি বা আমদানি করা পণ্যের পেছনে। কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনে এই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায়। পর্যটক যখন স্থানীয় পরিবারে থাকেন, স্থানীয় কৃষকের ফলানো খাবার খান, স্থানীয় হস্তশিল্পীর তৈরি পণ্য কেনেন কিংবা স্থানীয় তরুণকে গাইড হিসেবে নিয়োগ দেন, তখন সেই অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতির চক্রে ফিরে আসে। বান্দরবানের নীলগিরি, সাজেক ভ্যালি কিংবা মৌলভীবাজারের চা বাগান অঞ্চলে ইতিমধ্যে ছোট ছোট আকারে এই ধরনের হোমস্টে ও কমিউনিটি গাইড মডেল গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে, যদিও তা এখনো বিক্ষিপ্ত ও অসংগঠিত। একটি পরিবার যখন তার নিজের ঘরের একটি কক্ষ পর্যটকের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, তখন সেই পরিবারের সন্তানের শিক্ষার খরচ কিংবা কৃষিজমির বিনিয়োগ, উভয়ই নতুন একটি আয়ের উৎস খুঁজে পায়।

তবে এই মডেলকে রোমান্টিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব। একজন কৃষক পরিবারের সদস্যকে রাতারাতি আতিথেয়তা ব্যবস্থাপক বানানো যায় না, তার জন্য দরকার পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য নিরাপত্তা ও অতিথি ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ। দ্বিতীয় সমস্যা হলো বাজার সংযোগের অভাব, অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থাকলেও পর্যটকের কাছে সেই তথ্য পৌঁছানোর মতো ডিজিটাল মার্কেটিং কাঠামো নেই। তৃতীয়ত, আয়ের বণ্টন নিয়ে স্থানীয় সংঘাতের ঝুঁকিও থেকে যায়, কয়েকটি পরিবার সুফল পেলে বাকিরা বঞ্চিত বোধ করতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর। আর সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে পর্যটন বাড়লে তাদের সংস্কৃতিকে যেন কেবল প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত না করা হয়, বরং তাদের নিজস্ব মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বজায় রেখেই পর্যটন পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

সাতক্ষীরা জেলার প্রেক্ষাপটে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা কম নয়। সুন্দরবন ঘেঁষা শ্যামনগরের মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা, নদীপাড়ের কৃষিজীবন কিংবা ঐতিহ্যবাহী চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনা, এই সবকিছুই হতে পারে অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনের বিষয়বস্তু। পর্যটক যদি একদিন একজন মৌয়ালের সঙ্গে মধু সংগ্রহের গল্প শুনতে পারেন কিংবা একজন জেলে পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে পারেন, তা কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টের চেয়ে অনেক বেশি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও বাজার সংযোগ একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়।

কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রকৃত রূপান্তরকারী শক্তিতে পরিণত করতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, বিদ্যমান গাইডলাইনকে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা পর্যায়ে বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় রূপান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগ্রহী পরিবারগুলোর জন্য আতিথেয়তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভাষাগত দক্ষতার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে, যেখানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ কমিউনিটি ট্যুরিজম উদ্যোগগুলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে দৃশ্যমান করতে হবে। চতুর্থত, আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তুলতে হবে, যাতে সুবিধা কয়েকটি পরিবারে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রকৃত সম্পদ তার প্রকৃতি নয় শুধু, তার মানুষ, তার জীবনযাত্রা, তার সংস্কৃতিও বটে। কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন এই সম্পদকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের এক বাস্তবসম্মত পথ দেখায়, যেখানে উন্নয়নের সুফল শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগকারীর বদলে পৌঁছায় গ্রামের প্রকৃত মানুষের কাছে। এই মডেল সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কেবল আয় বৃদ্ধি করবে না, বরং গ্রামীণ তরুণদের শহরমুখী অভিবাসন ঠেকিয়ে তাদের নিজ জনপদেই মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাই স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকে প্রান্তিক আলোচনা নয়, বরং কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন