ঘটনাটি পড়ার পর আমি নিজেই হতভম্ব তাজ্জব বনে গেছি। আমরা সবাই জানি, ‘ভাত রান্নার সময় হাঁড়ির একটা ভাত টিপলেই বোঝা যায়, পুরো হাড়ি চাল সিদ্ধ হয়েছে কিনা।’ এ ধরনের প্রশ্ন উঠেছে, মহানগরীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে। খুলনা পাবলিক কলেজের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ‘মেরে ফেলার হুমকি’ দিয়ে মাদক ক্রয়ে বাধ্য ও জোর করে সেবনের অভিযোগ করে গত ৯ আগস্ট, ২০২৬ খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক মা লায়লা খাতুন এ ধরনের এক স্পর্শকাতর ঘটনার অভিযোগ পেশ করেছেন।
‘খুলনা গেজেট’- এ সেকেন্ড লিড আকারে প্রকাশিত ওই সংবাদটি এ অঞ্চলের অগণিত অভিভাবক ও পাঠককে উদ্বিগ্ন করেছে।
সংবাদের শিরোনাম ছিল : ‘জীবন নাশের হুমকি দিয়ে মাদক ক্রয় ও সেবনে বাধ্য/ ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন।’ ঘটনাটি খুলনার হৃৎপিণ্ডের উপর দাঁড়ানো বয়রা পাবলিক কলেজ-এর।
গত ৯ আগস্ট, রবিবার, ২০২৬ খুলনা পাবলিক কলেজের অভ্যন্তরের এ ধরনের অবনতিশীল অবস্থার বর্ণনা করে ওই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শেখ মোহাম্মদ আইয়ানের মা লায়লা খাতুন, চোখ কপালে তোলার মতো বিস্ফোরক এ ধরনের ঘটনার কথা সংবাদ সম্মেলনে পেশ করেছেন।
শেখ মোহাম্মদ আইয়ান সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে মাদক ক্রয়ে বাধ্য করা এবং জোর করে সেবন করানোর এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি খুলনার শিক্ষাঙ্গণের ক্রম অবনতিশীল অবস্থার একটি নগ্ন অথচ করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ পেশ করে লায়লা খাতুন বলেছেন, “মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া, জোরপূর্বক মাদক ক্রয় এবং তা সেবন করানোর ন্যক্কারজনক অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে, এ ব্যাপারে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, ওই প্রতিষ্ঠানে নিরীহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
ওই শিক্ষার্থীর মায়ের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘স্কুলের তিন চার জন সিনিয়র ছাত্র প্রায় সময় জোর করে সিগারেট খাওয়ানো সহ প্রতিনিয়ত আমার ছেলেকে ব্ল্যাক মেইল করতো।’
মা লায়লা খাতুন জানান, “২ আগস্ট ২০২৬ স্কুলের ছুটি শেষে অজ্ঞাতনামা একজন ছাত্র মাদক কেনার জন্য আমার ছেলেকে ৮৬০ টাকা দেয়। বাসায় আসার পর টাকা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে, ছেলে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলে।”
মা লায়লা খাতুন জানান, “এরপর আমার ছেলে আমাদের জানায়, অজ্ঞাতনামায় এক ছাত্র তিন আগস্ট ২০২৬ স্কুলে আসবে মাদক নেওয়ার জন্য। তারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। বিভিন্ন সময়ে সে তাদেরকে এক লাখ টাকা, ছয় আনা ওজনের দুটি স্বর্ণের আংটি দেয়। ছেলের কাছ থেকে এই ঘটনা জানতে পেরে বিষয়টি কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল মুনির আব্বাস সহ অন্যান্য শিক্ষকদের অবহিত করি।”
ছাত্রের মায়ের দাবি, ‘পরবর্তীতে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার ছেলের নিরাপত্তা দেবে বলে আশ্বস্ত করে। কিন্তু তারপরের দিনই ৩ আগস্ট ২০২৬ টিফিন টাইম শুরু হলে, আমার ছেলে ক্লাসের বাইরে সিঁড়ি থেকে নামার সময় অজ্ঞাতনামা ঐ ছাত্ররা কৌশলে সকল শিক্ষকের চোখ এড়িয়ে, তাকে সিঁড়ি থেকে সরাসরি তিনতলায় ওয়াশরুমে নিয়ে আটকে রেখে মাদক চায়। মাদক দিতে না পারায় প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে তারা তাদের কাছে থাকা ব্লেড দিয়ে ওর শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ডান ও বাম পায়ের উরু, বুকের বাম পাশে আঘাত করে। ফলে ওর গায়েপরে থাকা শার্ট এবং প্যান্ট কেটে যায়।”
শিক্ষার্থী আইয়ানের মা লায়লা খাতুন জানান, “মাদক অভ্যস্ত ওই ছেলেরা এও বলে শাসায় যে, ভবিষ্যতে তাদের অবাধ্য হলে এবং বিষয়টি কাউকে জানালে প্রাণে মেরে ফেলা হবে।”
আইয়ান এর মা লায়লা খাতুন জানান, “হুমকি দেওয়ার পর, তারা আমার ছেলেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং দশ পিস ইয়াবা এনে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘটনা স্থল ত্যাগ করে। এ সময় ওই নেশাখোর ছেলেদের একজন আমার ছেলেকে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয়, যার মধ্যে : ০১৯৬৭-৬৩৮৪৯৫ মোবাইল নাম্বারটি লেখা ছিল। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠান প্রধান কে অবহিত করি এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলে তিনি বিষয়টি চাপা দেওয়ার জন্য সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।”
শিক্ষার্থীর মা লায়লা খাতুন জানান, “নিরুপায় হয়ে পরবর্তীতে ছেলের জীবনের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় থানায় অভিযোগ করি। ৬ই আগস্ট ২০২৬ পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত শুরু করা কালে পুলিশের কাউকে না জানিয়ে, পুলিশের কোনো অনুমতি না নিয়ে ওই স্কুলের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেবেকা ইয়াসমিন আমার অসুস্থ ছেলেকে ১ ঘণ্টা যাবৎ জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেনস্তা করে।”
শিক্ষার্থী আইয়ানের মা লায়লা খাতুন আরও অভিযোগ করে জানান, “আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ছাত্রদের দ্বারা ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রায়শ : শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়। ছোট ছোট বাচ্চাদের জোর করে বাথরুমে নিয়ে কখনো শারীরিক নির্যাতন, কখনো ভয়-ভীতি হুমকি দিয়ে জিম্মি করে অর্থ এবং মাদকদ্রব্য আনতে বাধ্য করা এবং পাশের পরিত্যক্ত ভবনে ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। অভিভাবকদের কাছে যদি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা এসব কথা প্রকাশ করে, তাহলে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়। এসব অনৈতিক স্বেচ্ছাচার জবরদস্তি মূলক কাজের সাথে নবম দশম এবং একাদশ শ্রেণির কতিপয় ছাত্র জড়িত। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন কিন্তু তাদের সম্পর্কে কোন রকম ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাকুক কলেজ প্রশাসন বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলে।”
এখন প্রশ্ন ওঠে, এই যদি হয় খুলনা মেট্রোপলিটন শহরের নাকের ডগায় একটি খ্যাতিমান ইস্কুল এন্ড কলেজের চিত্র, তাহলে আমরা আছি কোথায়? সচেতন মহলের এ জিজ্ঞাসা মনে হতেই পারে। বিষয়টি ওই প্রতিষ্ঠানের ঝানু অধ্যক্ষ জানার পরও যখন কোনো ব্যবস্থা নেননি তাহলে ধরে নিতে হবে অধ্যক্ষ নিজেই গা বাঁচিয়ে চলছেন। সচেতন মহলের প্রশ্ন, এভাবে রাখ ঢাক করে ওই প্রতিষ্ঠানে নষ্টামি কেলেঙ্কারি আর কতদিন চলবে?
সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে যেমন তা তাড়ানো কঠিন, ঠিক এখানকার অবস্থা তো তাই হয়েছে! আইয়ানের মা অভিভাবিকার অভিযোগ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, নবম দশম এবং একাদশ শ্রেণির চিহ্নিত যে ভণ্ড ছাত্ররা নেশা আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন এ ধরনের কুৎসিত কাজ করে শিক্ষাঙ্গণের শৃঙ্খলা বিষিয়ে প্রশ্ন তুলছে অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থাৎ অধ্যক্ষ কর্নেল মুনির আব্বাস সম্পূর্ণ নির্বিকার নিশ্চুপ! এ ধরনের হাত-পা গোটানো অধ্যক্ষের এর কাছে অভিভাবকরা তাদের সন্তান পাঠাবে কোন সাহসে? যেখানে ছাত্রের প্রাণের নিরাপত্তা নেই! বিষয়টি খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষসহ গোটা প্রশাসন মিলে প্রতিষ্ঠানকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ বিষয়টি আবারও বলি, পাবলিক কলেজ কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন। কোনো অঘটন পরবর্তীতে বড় আকারে ঘটলে, তা প্রতিষ্ঠানের জন্য হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর। ঝরে যাবে কতগুলো মূল্যবান জীবন! আবারও বলি, কথাগুলো মাথায় রাখবেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

