বেশ কিছুদিন ভাবছি, গত ২০ বছর আমাদের এই হতভাগা দেশ, কি গভীর অন্ধকারেই না ছিল! পলাতক-পরাজিত সরকার শুধু দেশটার অর্থ সম্পদ লুট করেনি, পুরো দেশটাই ধ্বংস করে গেছে। কারণ একটি দেশ ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম তার শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা কে ধ্বংস করতে হয়। কুখ্যাত ডাইনি শেখ হাসিনা সরকার আমলেই তাই- ই হয়েছিল অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। মাত্র সাড়ে ১৫ বছরে ঐ সরকার ব্যবসা হিসেবে দুই দুটি শিক্ষা কারিকুলাম দিয়েছিল। তুলনামূলকভাবে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ৩০-৪০ বছরেও একটি শিক্ষা কারিকুলামও তারা দিতে পারে না। সেখানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১২ সালে একটি এবং ২০২২ সালে একটি মোট দুইটি শিক্ষা কারিকুলাম হতভাগা জাতির উপর চাপিয়ে দিয়ে দেশটাকে ধ্বংসের শেষ কিনারে নিয়ে যায়।
অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে চব্বিশের জুলাইয়ে রক্তাক্ত বিপ্লব আমাদের জাতিসত্তাকে আবার সঠিক পথে ফেরার ঠিকানা দিয়েছে। ২৪ এর রক্তাক্ত বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা কারিকুলাম পুনরায় ২০১২ সালের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার ফলে বিধ্বস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে, ধীরে ধীরে। এরই মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মুখ দেখেছি। জাতির সমূহ সর্বনাশ যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ বেকার। কর্ম সংস্থানের কোনো পথে খোলা নেই। অথচ সারাদেশে এক শিক্ষা বিভাগেই বিশাল সংখ্যক শিক্ষক সংকট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক সংকটের কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
অনেক গভীর অন্ধকারে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো খবর! নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় সরকারের আপিল বিভাগ সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক নিয়োগে আর কোনো বাধা থাকলো না। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সবকিছুই আনসেটেলড ছিল।
দেশের শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের সংকট দূর করতে এক লাখের বেশি শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বত্রিশ হাজার পাঁচশো জন প্রধান শিক্ষক এবং বিভিন্ন এমপিও ভুক্ত স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষক প্রভাষক নিয়োগের পথ খুলেছে।
গত ৩ জুলাই, ২০২৬ রাজধানীর একটি হোটেলে ইউনেস্কো আয়োজিত ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ এডুকেশন সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন গ্রান্ট অ্যান্ড মাল্টিপ্লয়ার গ্রান্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ ধরনের এক আশাব্যঞ্জক ঘোষণা দেন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
মন্ত্রীর ঘোষণা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় এর ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় শেষ পর্যন্ত সরকারের আপিল বিভাগ সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত ২০১৭ সাল থেকে ঝুলে পড়া জটিল সমস্যার আপাত একটা সমাধান হলো। এর ফলে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে এখন নিয়োগ অত্যন্ত অবাধে শুরু করা সম্ভব হবে। শিক্ষামন্ত্রী মিলন সাহেব অবশ্য আরও একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন, তা হলো–এই নিয়োগের পাশাপাশি দেশের এমপিও ভুক্ত বিভিন্ন স্কুল কলেজ মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরও প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যা দেশের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় অগ্রগতি।
বলাবাহুল্য, গত ২০ বছরে হাসিনাময় বাংলাদেশে, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের পরিকল্পনা হিসেবে তার শাসন আমলের ওই সাড়ে ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন এমপিও ভুক্ত স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক ২০১০-১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নিয়োগ পেয়েছে তাদের অধিকাংশই এমপিও ভুক্ত না হওয়ার কারণে আর্থিকভাবে অসচ্ছলতায় এবং দারিদ্রতার জন্য মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিক্ষামন্ত্রীর এই পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গণমুখী পদক্ষেপ। যার ফলে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়োগ পাওয়া অসহায় শিক্ষকরা সামান্য হলেও একটু আলোর মুখ দেখতে পাবে।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ যা এনটিআরসিএ নামে পরিচিত ওরাও এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭৮ হাজার শূন্য পদের নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে আমাদের বক্তব্য, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আমলে উপেক্ষিত দীর্ঘদিন নিয়োগপ্রাপ্তদের ব্যাপারে প্রথম সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের শিক্ষা বিভাগের উচিত বলে মনে করি।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী একটি হতাশার খবরও দিয়েছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা শিক্ষার্থী ঝরে পড়া। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া ৫ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সাধারণ বিচারে প্রায় ৩৩ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ। এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় ৪৪ শতাংশ ঝরে পড়েছে। যা দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দারুণ উদ্বেগ জনক। আমাদের মনে হয়, ২০১৯ সালের করোনা এবং ২০২২ সালের ‘রান্নাবান্না পদ্ধতির’ ফালতু শিক্ষা কারিকুলাম এর জন্য অনেক অংশে দায়ী।
শিক্ষামন্ত্রী প্রায় ২ দশকের চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, “২০০১ থেকে ২০০৬ সালে তুলনায় শিক্ষাব্যবস্থা দারুণভাবে পিছিয়ে গেছে। সরকারের বর্তমান নিয়োগ পরিকল্পনা অনতিবিলম্বে বাস্তবায়িত হলে অন্তত দেশের সরকারি ও এমপিও ভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট নিরসনের পাশাপাশি দুঃখিত তরুণ বেকারেরও কিছুটা কর্মসংস্থান হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত পরিবর্তনেরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমরা মনে করি।”
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

