ঈদ বছরে দুইবার আসে। একটি ঈদ শেষ হতে না হতেই আরেকটি ঈদের অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এখন আর ঈদের সেই আগ্রহ বা আনন্দটা আগের মতো অনুভব করি না। ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিল অন্যরকম এক উচ্ছ্বাস, এক অদ্ভুত ভালো লাগা।
ঈদ আসছে মানেই নতুন জামা কেনার উত্তেজনা। দোকানে গিয়ে বাবা-মায়ের পছন্দের জামা দূরে সরিয়ে নিজের পছন্দের জামা বেছে নেওয়ার চেষ্টা। নানার সঙ্গে বাজারে গিয়ে দোকানের ভেতর কান্নাকাটি করে নিজের পছন্দের জুতা কেনা-এসব ছিল ঈদের আনন্দেরই অংশ। দোকানের পুতুলের গায়ে যে জামা পরানো থাকত, সেটাকেই মনে হতো সবচেয়ে সুন্দর। তখন নানির কাছে বায়না ধরে সেই জামাটাই কিনে নেওয়ার আনন্দ ছিল আলাদা। আমার ছোটবেলার একটি ঈদের কথা আজও খুব মনে আছে। সালটা সম্ভবত ২০০৩ বা ২০০৪। ঘটনাটি মনে থাকার বিশেষ কারণ একটি কমলা রঙের স্কার্ট। ঈদ যত এগিয়ে আসছিল, আমার বায়নাও তত বাড়ছিল। তখনও স্কুলে ছুটি পড়েনি, তাই মা-বাবা আমার জামা কিনে দিতে পারেননি। একদিন নানার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কাঁদতে কাঁদতে বললাম-আমার তো এখনও জামা কেনা হয়নি, ঈদ চলে যাবে, দোকানে ভালো জামাও আর থাকবে না।
পরের দিন দুপুরের মধ্যেই নানি মায়ের স্কুলে গিয়ে তাঁকে নিয়ে বাজারের প্রায় সব দোকান ঘুরে আমার জন্য একটি কমলা রঙের স্কার্ট কিনে আনলেন। তখন ভরদুপুর, বাইরে তীব্র রোদ। কিন্তু নতুন জামা পেয়ে আর অপেক্ষা করতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গেই জামা পরে বাড়ির সবাইকে ডেকে দেখাতে শুরু করলাম। যখন সবাই বলছিল, “জ্যোতির নানি জ্যোতির জন্য খুব সুন্দর একটা জামা কিনেছেন”-তখন আনন্দে মন ভরে গিয়েছিল।
আর একটু বড় হওয়ার পর, যখন চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন ঈদের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে রোজার ঈদে। কারণ তখন বুঝতে পারতাম-ঈদ মানেই কয়েকদিন বই খাতা ধরতে হবে না। মা ঘরে মজার মজার খাবার রান্না করতেন, আর আমরা ভাই বোনেরা ইচ্ছেমতো আনন্দ করতাম।
একবার এমনও হয়েছে, মা তখনও বেতন বা বোনাস পাননি। কিন্তু আমি একদিন সকাল থেকেই কান্না শুরু করে দিলাম-আজই আমাকে জামা কিনে দিতে হবে। টাকা কোথা থেকে আসবে, সেটা আমি বুঝতে চাই না। বাড়ির কাকুরা মজা করে বলতেন, “জ্যোতি তোকে তোমার বাবা কুড়িয়ে পেয়েছে, না হলে এতক্ষণে তোকে জামা কিনে দিত।” এই কথা শুনে আমার কান্না আরও বেড়ে যেত।
পরে জেনেছিলাম, সেদিন মা আমাকে শান্ত করতে না পেরে নিজের কানের দুল বন্ধক রেখে আমার জন্য জামা কিনে দিয়েছিলেন। তখন অবশ্য কিছুই বুঝিনি, শুধু নতুন জামা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। এখন বড় হয়ে সেই ঘটনা মনে পড়লে ভীষণ লজ্জা লাগে, আবার মায়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাও অনুভব করি।
ঈদের আগে নতুন জামা, জুতা, ব্যাগ-সবকিছু মিলিয়ে সাজগোজের আনন্দ ছিল আলাদা। তবে জামাটা আগে কাউকে দেখানো যাবে না-এমন এক গোপন উত্তেজনাও ছিল। সবাই যখন একসঙ্গে বসে জামা দেখত, আর কেউ বলত “জ্যোতির জামাটাই সবচেয়ে সুন্দর”-তখন মনে হতো ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণ হলো।
ঈদের আগের দিন ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত। সকালে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজ শেষ করে আমরা ভাইবোনেরা মিলে পাটখড়ি দিয়ে বাড়ির সামনে গেট বানাতাম। সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ দেখা গেলে দৌড়ে বাড়িতে এসে সবাইকে “ঈদ মোবারক” বলতাম। তারপর শুরু হতো আরেক মজা। বাগান থেকে বড় কচুপাতা এনে তাতে ছোট ছোট ছিদ্র করতাম। এরপর নারকেলের শুকনো ছোবড়া জ¦ালিয়ে সেই পাতায় আগুন নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে আগুনের ফুলকি ছড়াতাম-সেই আনন্দ আজও মনে পড়ে।
রাতে ঘর সাজানো, বেলুন ও রঙিন কাগজের ফুল দিয়ে সাজসজ্জা, হাতে মেহেদি দেওয়া-সব মিলিয়ে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতো। মেহেদি দেওয়ার জন্য যে সবচেয়ে ভালো পারত, তাকে আগেই বলে রাখতে হতো, নইলে সিরিয়াল পাওয়া যেত না।
ঈদের সকালে নতুন সাবান-শ্যাম্পু নিয়ে পুকুরে গোসল করতে যেতাম। তারপর নতুন জামা পরে বড়দের সালাম করে সালামি নেওয়া ছিল ঈদের অন্যতম আনন্দ। আমি আবার সবাইকে বলতাম-“আমি তো তোমাকে গোসল করিয়েছি, তাই আমাকে একটু বেশি সালামি দিতে হবে!” সকালে সেমাই খাওয়া, তারপর নামাজ শেষে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প আর খাওয়াদাওয়া-এইভাবেই কাটত ঈদের দিন। বিকেলে মায়ের সঙ্গে খালার বাড়ি, আর পরের দিন নানির বাড়ি-আনন্দ যেন শেষই হতো না।
এখনও ঈদ আসে, ভালোও লাগে। কিন্তু ছোটবেলার মতো সেই কান্নাকাটি করে জামা কেনা, গেট বানানো, দাদাদের গোসল করানো-এসব আর হয় না। তাই মনে হয়, ঈদের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা হয়তো ছোটবেলাতেই থাকে। তবু ঈদ আসুক সবার জীবনে আনন্দ নিয়ে। পরিবারের মুখে হাসি ফুটুক, সবাই একসঙ্গে ভালো থাকুক-এই কামনাই রইল।
খুলনা গেজেট/এনএম

