বুধবার । ১৮ই মার্চ, ২০২৬ । ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা ওসমান হাদী

পলাশ রহমান

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে ঘিরে মনে হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তব ক্ষেত্রেও এর কিছু দৃশ্যমান দিক সামনে আসছে।

সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্তকে ভারতের মাটিতে গ্রেপ্তারের ঘটনা। এটি কেবল একটি আইনগত পদক্ষেপ নয়, বরং দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যদি এই ধরনের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তাহলে সীমান্তপাড়ের অপরাধও মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।

এছাড়া জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যা পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশে আসবে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে অনেক দেশই সংকটে পড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের মতো উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে এবং জ্বালানি পরিবহনের খরচ ও ঝুঁকি কমে যাবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক সম্মান ও ভারসাম্য। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে ছিলো না। ফলে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি দুই দেশ পারস্পরিক ‘স্বার্থ ও সম্মান’ ভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তবে তা উভয় দেশের জন্য উপকারী হবে।

বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের একটি বাস্তব রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। ভারতের মাটিতে অবস্থানরত পলাতক রাজনৈতিক অপরাধীদের প্রসঙ্গ প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিশ্বাস করে, গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, এ প্রসঙ্গ জনমনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। যদি বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়, দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে এই ধরনের ইস্যুগুলো মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ হবে। এতে সীমান্তপাড়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা অস্থিরতার সম্ভাবনাও কমবে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ওসমান হাদী হত্যা মামলার অভিযুক্তদের জন্য কনসুলার অ্যাক্সেস চেয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার হলে তার দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া আন্তর্জাতিক নিয়মের অংশ। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে দুই দেশের মধ্যে আইনি সহযোগিতা আরও সুসংগঠিত হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক সবার জন্যই মঙ্গলজনক। বাংলাদেশ ও ভারত যদি বাস্তববাদী ও পরিণত কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে তা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কূটনীতিতে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এমন একটি নীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সমন্বয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন