শনিবার । ১৪ই মার্চ, ২০২৬ । ১লা চৈত্র, ১৪৩২

এমপি হাসনাতের জবাবদিহিতার হিসাব ফেসবুকে, বাকিরা কোথায়?

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন শেষ হলেই যেন জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি হয়— এমন অভিযোগ বহুদিনের। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, আর ভোটের পরে দীর্ঘ নীরবতা— এ যেন এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের নির্বাচিত এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। নির্বাচনে জয়ের পর তিনি যে ধরনের জবাবদিহিতার সংস্কৃতি শুরু করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন তার এলাকায় আসা বিভিন্ন ত্রাণ ও সহায়তার বিস্তারিত হিসাব। সৌদি আরব থেকে আসা খেজুরের পরিমাণ কত, কোথায় কত চাল বিতরণ করা হবে, কোন জনপ্রতিনিধি বা সংগঠনের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হবে— এসব তথ্য খোলাখুলিভাবে জানাচ্ছেন তিনি। শুধু তথ্য দেওয়াই নয়, বরং কোন এলাকায় কীভাবে এই সহায়তা পৌঁছাবে, তাও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করছেন। ফলে জনগণের কাছে বিষয়টি একেবারে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি সত্যিই এক বিরল উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর থেকে বহু নির্বাচনের সাক্ষী হয়েছে দেশ। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর একজন এমপি তার এলাকায় প্রাপ্ত সহায়তা কিংবা উন্নয়ন কার্যক্রমের এমন খোলামেলা হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরছেন— এমন ঘটনা খুব বেশি দেখা যায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি মানুষের নজর কেড়েছে এবং প্রশংসার ঢেউ উঠেছে নেট দুনিয়ায়।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু একটি ব্যক্তিগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। সেই বার্তাটি হলো—জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া মানেই শুধু ক্ষমতা ভোগ করা নয়; বরং জনগণের প্রতি জবাবদিহি থাকা। গণতন্ত্রের মূল শক্তি এখানেই নিহিত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জবাবদিহিতার অভাব। নির্বাচনের সময় ভোটারদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, পরে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে জনগণের সামনে খুব কমই হিসাব দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়নের তথ্য বা সরকারি সহায়তার বণ্টন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।

এই বাস্তবতায় যদি একজন এমপি নিজ উদ্যোগে সবকিছু স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে শুরু করেন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। কারণ স্বচ্ছতা শুধু দুর্নীতি কমায় না, বরং জনগণের আস্থাও বাড়ায়। যখন মানুষ দেখতে পায় যে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রতিটি কাজের হিসাব দিচ্ছেন, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়।

এমপি হাসনাত আবদুল্লাহর উদ্যোগ তাই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখন অনেক সহজ। আগে যেখানে একটি প্রতিবেদন বা সংবাদ প্রকাশ হতে সময় লাগত, এখন সেখানে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একটি পোস্ট হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে জনপ্রতিনিধিদের জন্য জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই উদ্যোগ কি শুধুই একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি একটি বৃহত্তর সংস্কৃতিতে পরিণত হবে?

বাংলাদেশের অন্যান্য সংসদ সদস্যদের জন্য এখানেই রয়েছে বড় একটি শিক্ষা। যদি দেশের প্রতিটি নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের এলাকায় বরাদ্দ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্প, ত্রাণ কিংবা সরকারি সহায়তার বিস্তারিত তথ্য নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরেন, তাহলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে যাবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগও অনেক কমে যাবে।

গণতন্ত্রে জনগণই হলো ক্ষমতার মূল উৎস। তাই জনগণের কাছেই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহি করতে হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই সংস্কৃতি অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে তাদের কাজের অগ্রগতি, ব্যয় এবং পরিকল্পনার হিসাব প্রকাশ করেন। ফলে জনগণ সহজেই বুঝতে পারে তাদের ভোট কতটা সঠিক জায়গায় গেছে।

বাংলাদেশেও যদি এই ধরনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বেড়ে যাবে। রাজনীতির প্রতি যে অনাস্থা বা হতাশা অনেক সময় দেখা যায়, তা অনেকাংশে দূর হতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি— স্বচ্ছতা যেন কেবল প্রচারণার মাধ্যম হয়ে না ওঠে। প্রকৃত স্বচ্ছতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তথ্য হবে নির্ভুল, ধারাবাহিক এবং যাচাইযোগ্য। অর্থাৎ শুধু একবার পোস্ট দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না, বরং নিয়মিতভাবে সেই হিসাব প্রকাশ করতে হবে এবং জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

এই জায়গায় এসে হাসনাত আবদুল্লাহর উদ্যোগকে একটি সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে এবং অন্য এমপিরাও যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কারণ বর্তমান সময়ে জনগণ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তির কারণে এখন তথ্য লুকিয়ে রাখা আগের মতো সহজ নয়। ফলে জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে। তারা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, বরং বাস্তব কাজ দেখতে চায়।

এই বাস্তবতায় রাজনীতিবিদদেরও নিজেদের কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে। জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি তুলে ধরতে হবে।

কুমিল্লা থেকে শুরু হওয়া এই ছোট উদ্যোগ তাই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কারের একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে। যদি এটি সত্যিই একটি নতুন ধারার সূচনা করে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।

সবশেষে বলা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহ যে উদ্যোগ শুরু করেছেন, তা কেবল প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং এটিকে একটি জাতীয় আলোচনায় পরিণত করা দরকার। দেশের প্রতিটি জনপ্রতিনিধির সামনে প্রশ্ন উঠুক—তারা কি তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত?

কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার আসল মালিক কিন্তু জনগণই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন