Edit Content
খুলনা, বাংলাদেশ
শনিবার । ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ । ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২
Edit Content

দুনিয়া কাঁপানো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এপিটাফ

আনোয়ার আলদীন

সময়ের পিঠে এপিটাফ রেখে কালের যাত্রায় বড় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে দিনক্ষণ। কোটা সংস্কারের টানা ৩৬ দিনের সংশপ্তক আন্দোলন থেকে দুনিয়া কাঁপানো অভাবনীয় অবিনাশী গণঅভ্যুত্থানে রূপ পরিগ্রহ করা যে রক্তাক্ত জুলাই বদলে দিয়েছে এই ভুখন্ডের ইতিহাস-স্রোতধারা; তার বর্ষপূর্তি পেরিয়েছে।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পরোয়াহীন জুলুম, স্বৈরাচারী নিপীড়ন-পীড়ন-উৎপীড়ন-নিগৃহ গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি রচনা করেছিল। এই অভ্যুত্থানে সারাদেশের নাগরিক শক্তির এক অভূতপূর্ব ও দুঃসাহসী ইস্পাত ঐক্য গড়ে ওঠে, যা চেপে বসা জগদ্দল শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী নাগপাশকে উৎখাত করেছিল। গত বছরের জুলাই মাসটা যেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় উৎকীর্ণ এক দাবানল—বিস্ফোরিত অগ্নিময় অধ্যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরের সংগ্রামের চূড়ান্ত মাইলফলক। নিকষ ফ্যাসিবাদ পতনের গহীন থেকে উদীত হয় এক নতুন সোনালি সূর্যের। এটা কোন মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল না।

এ গণঅভ্যুত্থান ছিল সময়ের দাবি ও অনিবার্য এক রাজনৈতিক পরম্পরা। একটি জাতির অবদমিত গণতান্ত্রিক চেতনার পুনর্জাগরণ। কার্যতঃ এই গণঅভ্যুত্থান সংকল্প দীর্ঘ জুলুমের পাটাতনের ওপর স্থাপিত হয়েছিল অনেক আগেই। যখন মানুষের সমস্ত অধিকার হরণ করে নিয়েছিল আওয়ামী চণ্ডনীতি, উৎকট ফ্যাসিবাদ। তারা মানুষের স্বপ্ন লুট করে নিয়েছিল, বাজেয়াপ্ত করেছিল কন্ঠ, ঘরে ঘরে ক্রন্দন, নিঃসঙ্গ অশ্রম্নপাতে ভারী হয়ে উঠেছিল আসমান-জমিন। একের পর এক গণআন্দোলন দমন, নির্জলা মিথ্যা নেরেটিভের ভেল্কি, গুম, খুন, হামলা-মামলা, আয়নাঘর, অলিগার্কদের লুটপাট স্বেচ্ছাচারিতার মোচ্ছব মানুষের মনে দগদগে দাগ কেটে দেয়। সর্বোপরি ভোটাধিকার দলিত করা হয়েছিল বীভৎস নির্মমতায়। মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল বিশ্বাস, হারিয়ে ফেলেছিল নিজের রাষ্ট্রে নিজের নাগরিকত্বের আত্মবিশ্বাস। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিহীন দীর্ঘ জুলুমের রুদ্ধশ্বাস নৃশংসতা থেকে মানুষের মনে যে বরাভয়, ক্ষত এবং বারুদ ভরা দ্রোহের জন্ম নিয়েছিল, সেখান থেকে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে জুলাইয়ে তাঁরা স্রোতের মতো নেমে এসেছিলেন পথে-প্রান্তরে, রাস্তায়। জুলাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল জুলুমবাজ আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়যজ্ঞের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানো অসমসাহসী ছাত্র—জনতার বীরত্বের স্মারকস্তম্ভ।

গত বছরের ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ রূপ নেয়। এটি ছিল প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পদধ্বনি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত ‘জুলাই বিদ্রোহে’ রূপ নেবে, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বেÑ এটা ছিল আপাত দৃষ্টিতে কল্পনাতীত। সরকার প্রতিবাদকারীদের কঠোরভাবে দমন করতে চাইলে পরিস্থিতি বিদ্রোহে রূপ নেয়। দ্রুত এক দফায় রূপান্তরের পেছনে ছিল হাসিনার কাপালিক হিংস্রতা।

জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলন শুধুমাত্র একটি দাবি পূরণের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের জনসাধারণের ন্যায্য, যৌক্তিক ও মৌলমানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এক অবিস্মরণীয়, দুর্দমনীয়, বৈপ্লবিক উৎক্ষেপ। স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রংপুরের শহীদ আবু সাইদ দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হবার অসম সাহসিকতার ভেতর দিয়ে জুলাই আন্দোলনের যে দাবানল বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার পটভূমি ক্রমে রচিত হয়েছিল।

১/১১ এর প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সামরিক ছাউনি নিয়ন্ত্রিত প্রশ্নবিদ্ধ ভোটে ক্ষমতায় এসে সর্বব্যাপী প্রতিহিংসা পরায়নতা, লুটপাট-দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হতে শুরু করে। সেই সময়ে তাদেও নেতাকর্মীদেও দৌরাত্ম্য বাড়ল; আমলা-পুলিশও চাটুকারিতায় নিয়োজিত হলো। ক্ষমতাসীনদের ঘিরে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হলো। সব অপকর্ম শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিকৃত করা হলো। বুদ্ধিজীবী শিল্পী-সাহিত্যিক নামক এক দল চাটুকর শেখ হাসিনার গুণকীর্তনে মগ্ন হলেন। তাকে বলতে শুরু করলেন, আপনি বিশ্বনেত্রী। আপনার মতো নেত্রী আর কোথাও নেই। নোবেল পুরস্কার আপনারই প্রাপ্য। হাসিনার আত্মম্ভরিতা- আমিত্ব সীমাহীন হলো।

শেখ হাসিনার জনবিচ্ছিন্নতা বাড়তে লাগল। যে গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য জান বাজি লড়াই করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান কায়েম করেছিল গোটা জাতি ; তা পরিহার করে ২০১৪ সালে সমস্ত বিরোধী দলকে মাঠের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় গেলেন হাসিনা। বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে গুম খুন জুডিশিয়াল কিলিংয়ে মদ-মত্ত হলো শাসকগোষ্ঠী। ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের আমি-ডামি ভোট রঙ্গের মধ্যে ভোটখেলায় আরেক মেয়াদে ক্ষমতা দখল করলেন ফ্যাসিবাদের বিমূর্ত প্রতীকে পরিনত হওয়া শেখ হাসিনা। তারও আগে এক দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের সূচনা সেই এক-এগারোর অশুভ ঐক্যের মাধ্যমে, বিএনপি আর জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার দেশীয় ষড়যন্ত্রের নকশা রচিত হয় আন্তর্জাতিক সহযোগীদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। বানোয়াট অভিযোগে সাবেক তিনবারের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে অন্তরীণ, গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে। বাদ গেলেন না তার ছোটভাই রাজনীতি থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা আরাফাত রহমান কোকো। ভয়ংকর নির্যাতনে প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি তারেক রহমান বাধ্য হলেন দেশ ছাড়তে, শুধু চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব¡ থেকে রক্ষা পেতে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের নির্বাচন কন্টকমুক্ত করতে বেগম জিয়াকে মিথ্যা সাজানো মামলায় ফরমায়েশি রায়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে হত্যা চেষ্টা অব্যাহত রাখে শেখ হাসিনার সরকার। বিনা চিকিৎসায় তাকে পঙ্গু করা হয়। বেগম জিয়াকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়। আর বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর ওপরে অকল্পনীয় নির্যাতন উৎপীড়ন চলানো হয়।

অপরদিকে বিগত দেড় দশক সময় ‘উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ’ -স্লোাগানের আড়ালে রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ লুটপাট ও বিদেশে অর্থপাচারই ছিল হাসিনাগংদের মূল লক্ষ্য। একদা এমপি-মন্ত্রীরা জনগণের কাছে আসতেন, তাদের কথা শুনতেন। জনগণ বলতে পারতেন, জিনিসপত্রের দাম না কমলে, ছেলেমেয়েদের চাকরি না হলে ভোটের বাক্সে জবাব দেব। শেখ হাসিনার শাসনামলে সে সুযোগ তিরোহিত হয়। নেতারা বলতেন নৌকা মার্কা পেলেই চলবে, ভোট লাগবে না। ভোটে জিততে ভোটার লাগে না, দরকার ক্যাডার আর আমলা-পুলিশের। লুটপাটের মওকার জন্য টানা শাসনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে; পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেলসহ নানা স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। তা ছাপিয়ে উঠেছে মন্ত্রী-এমপিদের বিত্ত-বৈভবের প্রতিযোগিতা; বেনজীর-মতিউরদের লুটপাটের কেচ্ছা-কাহিনি।

স্বয়ং পতিত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বলেছিলেন, তার একজন পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। কিন্তু আমজনতার আয় বাড়েনি, ব্যয় বেড়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসেবে অমিল। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, লুটপাট, দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে জনমনে যে ক্ষোভ জমাট বেঁধেছিল, তা আছড়ে পড়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। শাসকগোষ্ঠী বিস্মৃত হয়েছিলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নই কেবল উন্নয়ন নয়; জনগণের জীবনমানের উন্নয়নই আসল কথা।

এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান আমলের আইয়ুবের শাসনের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসন আমলেই রাস্তাঘাটসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল। শহর ও গ্রামে, রাজনীতিক ও আমলাদের মধ্যে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী জন্ম নিয়েছিল। তারাই ছিল আইয়ুবের তল্পিবাহক। ১৯৬৮ সালে ঘটা করে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন। সাধারণ মানুষের গায়ে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তাদের কষ্টবোধ ছিল, ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল, কেবল বিডি মেম্বাররাই ছিল ভোটের মালিক। জনগণ উপহাস করে বলত, আইয়ুবেব ৮০ হাজার ফেরেশতা; যার মধ্যে বাংলাদেশে ছিল ৪০ হাজার। ‘উন্নয়ন দশক’- এর এক বছরের মাথায় জনগণের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুন জ¦লেছিল ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে, যা স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়েছিল। ৫৫ বছর পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। স্বাধীন বাংলাদেশে গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন ঘটল আরও করুণভাবে।
একদা যাদেও ভোটাধিকার কেড়েছিলেন; ন্যায়সংগত দাবি অগ্রাহ্য করেছিলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-পুতি বলে উপহাস করেছিলেন। ভুলে গিয়েছিলেন সেই অমোঘ বাণী, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।’ সেই জাগ্রত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আধুনিক কালের নারী-রামেসেস হাসিনা। এ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন স্কুলছাত্র, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসাপড়ুয়া, শিক্ষক, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী ইত্যাদি নানা স্তর ও বর্গের মানুষ। বাম, ডান, মধ্যপন্থীর নানা পক্ষের রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকেরা আন্দোলনে যোগ দেন। নারী, শ্রমিক এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা সমাজে যারা নানাভাবে প্রান্তিক হয়ে থাকেন, তাদের অংশগ্রহণ ছিল অবারিত। নারীরা নানা পর্যায়ে আন্দোলনকে উজ্জীবিত রাখেন।

হিসেব-নিকেশে প্রমাণিত হয়েছে দেশের মালিক জনগণ। জনগণের শক্তিই বড় শক্তি। দুই সহস্রধিক ছাত্র-জনতার শাহাদাতের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। অথচ এই বিজয় অর্জন এতটা সহজ ছিল না, দীর্ঘ বছর ধরে আগ্নেয়গিরির লাভা উত্তপ্ত হতে হতে মহা বিস্ফোরণে অগ্নুৎপাতে উদগীরিত হয়েছে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই, ৫ আগস্টের দ্বিপ্রহরে।

কবিকন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে— জুলাই বললে লাল হয়ে যায় স্মৃতি/গণবিদ্রোহ, প্রত্যেক দিন লাশ/ ‘মুক্তি-অথবা-মৃত্যুর প্রস্তুতি জুলাই দীর্ঘ, ৩৬ দিনে মাস।

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা— বাসস। যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।
ভূমিপুত্র: কপিলমুনি, পাইকগাছা, খুলনা।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন