নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে নির্বাচনী মাঠ। প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের কথার লড়াই গড়াচ্ছে সংঘাতের পথে। নির্বাচনি মঞ্চে দলীয় প্রধান, জাতীয় পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলাসহ মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাকর্মী প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনায় কয়েকজন হতাহতের শিকারও হয়েছেন।
গত বছর ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। গেল ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হয়। তবে নির্বাচনি মাঠে এর আগে থেকেই চলছে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাকযুদ্ধ। এসব কথার লড়াই এখন অনেকটা সংঘাতপূর্ণ।
পুলিশের তথ্য মতে, গত বুধবার শেরপুরের জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষে এক জামায়াত নেতার মৃত্যু হয়। ওই দিন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শেরপুর-৩ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে বাগবিত-া শুরু হয়। একপর্যায়ে দু’পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় দু’দলের অন্তত ৩০ নেতাকর্মী আহত হন। হামলায় গুরুতর আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টার দিকে মারা যান।
শেরপুরের ঘটনা ছাড়াও দেশে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক হত্যার হিসেব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদী হত্যার ঘটনা। গত ১২ ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর পল্টন থানাধীন কালভার্ট রোডে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এছাড়া গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যা ও ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক মোঃ নজরুল ইসলাম হত্যার তথ্যও দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
গত ২৮ জানুয়ারি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলাধীন ১০নং বিসকা ইউনিয়নের বিষটা বাজার এলাকায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
একই দিন দুপুর দেড়টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদি ইউনিয়নের বাবলাতলা গ্রামে দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে এক পক্ষের নেতৃত্ব দেন ইস্রাফিল মোল্যা এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াদুদ মোল্যা, শাহাবুদ্দিন মোল্যা ও চান মিয়া।
দু’গ্রুপের সবাই আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পাশ্ববর্তী ঘারুয়া ইউনিয়নের গঙ্গাধরদি গ্রামে ফরিদপুর-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুলের নির্বাচনি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তারা বিএনপিতে যোগ দেন।
ওই সভায় শহিদুল ইসলাম বাবুলের উপস্থিতিতে উভয়পক্ষের নেতারা বক্তব্য রাখেন। এসময় ইস্রাফিল মোল্যা দীর্ঘ সময় ধরে বক্তব্য দিলে ওয়াদুদ মোল্যার সমর্থক শহিদুল ইসলাম শান্ত নামে এক যুবক এতে বাধা দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
এরই জের ধরে বুধবার দুপুরে ইস্রাফিল মোল্যার ছোট ভাই জাকারিয়া মোল্যার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এতে জাকারিয়া মোল্যা, জাহিদ মোল্যা, লাভলী বেগমসহ কয়েকজন আহত হন।
পুলিশের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানা এলাকার সমেশপুর এবং তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর ২০ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার উজিরপুরে ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর উঠান বৈঠকে নেতাকর্মীরা বিএনপিকে উদ্দেশ করে কটাক্ষমূলক বক্তব্য দেয়। এর জের ধরে বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। এ সময় তিন-চারজন আহত হন। এ ঘটনার ঠিক দুদিন পর ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকার পুরনো বাসস্ট্যান্ড ওভারব্রিজের নিচে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এমএ মতিনের বহরে হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। সেখান থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লা সদরে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
লক্ষীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার চরশাহী ইউনিয়নের সৈয়দপুর বটতলা এলাকায় ১৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নারী কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট বিতরণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বিএনপির চার-পাঁচজন এবং জামায়াতের একজন সমর্থক আহত হন। পরদিন লক্ষীপুরের ওই ইউনিয়নেই জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের সদর থানার রিফিউজি মার্কেট এলাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির কর্মীদের লিফলেট দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় দলের একজন করে আহত হন। পরে ২৫ জানুয়ারি লক্ষীপুরের চন্দ্রগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি সমর্থক বাঁধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এতে জামায়াত সমর্থক তারেক ইসলাম আহত হয়।
নির্বাচনী মাঠে এ পর্যন্ত সর্বমোট ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উপরের ঘটনা¯ল ছাড়াও পাবনা জেলার সাঁথিয়া ও চাটমোহর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম, ধুনট ও শিবগঞ্জ থানা, টাঙ্গাইলের সদর, বাসাইল ও গোপালপুর, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, অষ্টগ্রাম ও সদর, ফরিদপুরের কোতোয়ালি ও ভাঙ্গা, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার মিরপুর মডেল ও খিলক্ষেত থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী, পদ্মা সেতু (উত্তর) থানা, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, পটুয়াখালীর বাউফল ও গলাচিপা, ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও ভালুকা থানা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের পতেঙ্গা ও বন্দর থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে নওগাঁর নিয়ামতপুর ও রানীনগর, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর, নেত্রকোনার কেন্দুয়া, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ; রাজশাহী মেট্রোপলিটনের শাহমখদুম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, বরিশালের মুলাদী, গাইবান্ধার সাঘাটা, মেহেরপুরের সদর, বরিশালের মুলাদী, ফেনীর ছাগলনাইয়া, শরীয়তপুরের পালং এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানা এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৮ দিনে সারা দেশে ১৪৭টি নির্বাচনী সহিংসতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৮টি। এছাড়া ভীতি দেখানো এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ছয়টি, প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাকযুদ্ধ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনী মাঠ কঠিন হয়ে পড়ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম



