শনিবার । ২৪শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১০ই মাঘ, ১৪৩২

ইসলামপন্থীদের ভোট এখন তিন বাক্সে বিভক্ত

গেজেট ডেস্ক

‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে ইসলামী আন্দোলনের সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনীতি কার্যত তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর একদিকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’, এই মোর্চায় ইসলামি দল পাঁচটি। অন্যদিকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এককভাবে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে। আর তৃতীয় ধারায় বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে নির্বাচনী সমঝোতায় যুক্ত তিনটি ইসলামি দল—যাদের একটি নিবন্ধিত ও দুটি নিবন্ধনহীন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে এই বিভাজন শুধু কৌশলগত নয়; বরং আদর্শ, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের পুরোনো সংকটকে নতুন করে প্রকাশ্যে এনেছে।

সংখ্যাগত দিক থেকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে জামায়াতসহ পাঁচটি ইসলামি দল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, আহমদ আবদুল কাদেরের খেলাফত মজলিস ও সরওয়ার কামাল আজিজীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, হেফাজত, জমিয়ত ও ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতার মুখে জামায়াতের জন্য ভোটের মাঠে ‘ভ্যানগার্ডের’ ভূমিকা নিতে পারে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটব্যাংকে মামুনুল হকের ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে। কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ও আলেমদের কাছে মামুনুল হকের পিতা প্রয়াত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব।

এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতাদের দল এনসিপি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের এলডিপিকে এই মোর্চায় অন্তর্ভুক্তিকে জামায়াত বড় অর্জন হিসেবে দেখছে। ‘মৌলবাদী জোটের’ অভিযোগ মোকাবিলায় এই দুটি দলকে ‘ব্যানার’ হিসেবে পাওয়া গেছে।

এই বিচ্ছেদের প্রভাব কী হতে পারে

ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের পরই ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান। সারা দেশে দলটির ভোট ও সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। জামায়াতের মোর্চা থেকে তাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের ঝুঁকিটা একটু বেশি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করে আসছেন।

অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ তিনটি ইসলামি দল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসনে বিএনপি ছাড় দিয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধনহীন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশও এই সমঝোতার অংশ। নিবন্ধনহীন জমিয়তের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে বিএনপি যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের পরই ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান। সারা দেশে দলটির ভোট ও সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। জামায়াতের মোর্চা থেকে তাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতি হতে পারে।

প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোটও শিগগির বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ও নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও এই অংশ দীর্ঘদিন নেতৃত্বসংকটে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মুফতি আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত আমিনী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ প্রকাশ্যে নেই। সম্প্রতি সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আমির মাওলানা আবদুল কাদের ও মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি পেয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে স্বীকৃতি পাওয়ায় দলটি মাত্র তিনটি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের কাজ করতে হলে ইসলামের কিছু বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার বা ঘোষণা লাগবে। সেটি হলে আমরা বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে রাজি।’

এই প্রেক্ষাপটে হেফাজত, জমিয়ত, ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দূরত্ব ভোটের মাঠে জামায়াতবিরোধী হাওয়া আরও উসকে দিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

ইসলামপন্থীদের ভোট এক বাক্সে আনার স্বপ্ন ভেঙে এখন বাস্তবতা তিন ধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিল। এই বিভাজনের পরও কৌশলগতভাবে সংগঠিত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। তবে ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি ও বিএনপির সঙ্গে থাকা ইসলামি দলগুলোর সমন্বয় ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

নির্বাচনী আসন সমঝোতা নিয়ে এই বিভক্তিকে ‘ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন তিক্ততার বীজ বপন’ হিসেবে দেখছেন ইসলামবিষয়ক লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ। তিনি  বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে এই বিভক্তি নির্বাচনী রাজনীতিতে সব পক্ষের জন্য একটা ধাক্কা হিসেবে কাজ করবে। আমি বলব, এটা তাদের অপরিণামদর্শিতা। এত দিন ধরে তাঁরা জোট জোট করছেন, কিন্তু কী এত প্রেম যে আসন সমঝোতা নিয়ে খসড়া আলোচনাটা পর্যন্ত তাঁরা করলেন না।’

 

খুলনা গেজেট/এইচ




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন