যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিদায়ী ভাষণে বিশ্ব নেতাদের প্রতি এক জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদে দেওয়া শেষ ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় সংস্কারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে জাতিসংঘ।
পর্তুগালের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আগামী ৩১ ডিসেম্বর তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পাঁচ বছর পূর্ণ করবেন। এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক তদারকির আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। এমন এক সময়ে তিনি এ আহ্বান জানালেন, যখন জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ এআই খাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নিউইয়র্কে প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা সমবেত হলেও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা এই সমাবেশ এড়িয়ে গেছেন। গুতেরেস তার বক্তব্যে সংস্থাটির ভেতরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার চিত্রও তুলে ধরেন।
নিজের এক দশকের মেয়াদে যেসব উদ্যোগ নিয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন, ভাষণে সেগুলোর ওপর পুনরায় জোর দেন জাতিসংঘের এই মহাসচিব। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, জলবায়ু সংকটের জন্য দূষণকারীদের ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আমূল সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। এ সময় উপস্থিত প্রতিনিধিরা করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানান।
এই ভাষণের মধ্য দিয়ে গুতেরেসের এক দশকের নেতৃত্বের সমাপ্তি ঘটল। এ সময়ে তিনি একদিকে সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে এআইয়ের মতো উদীয়মান প্রযুক্তি পরিচালনার প্রধান মঞ্চ হিসেবে সংস্থাটিকে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। যদিও অনেক পরাশক্তি জাতিসংঘকে এড়িয়ে চলেছিল এবং ওয়াশিংটন নিয়মিত তহবিল কাটছাঁট করেছে।
সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে গুতেরেস বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্য পরস্পরের মাঝে বিনিময় করতে হবে। এআইয়ের পরীক্ষা ও মূল্যায়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সবার সুরক্ষায় একটি একক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে হাঁটতে হবে।
তিনি বলেন, এআইয়ের দায়িত্বশীল গতি বজায় রাখা ও নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা জোরদারে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদারকির মাধ্যমে একটি বহুপাক্ষিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
এদিকে, রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চলতি সপ্তাহের শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন নতুন এআই নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত আলোচনা থেকে উঠে আসা এই প্রস্তাবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেকোনো এআই দুর্ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এআইয়ের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা
গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরেই এআইয়ের বৈশ্বিক তদারকি বা কাঠামোগত পরিচালনার পক্ষে কাজ করে আসছেন। ২০২৩ সালে তার উদ্যোগে ৩৯ সদস্যের একটি এআই বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও জাপানের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদরা যুক্ত হন। ওই একই বছর নিরাপত্তা পরিষদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে প্রথমবারের মতো আলোচনায় বসে। সেই সময় চীন সতর্ক করে বলেছিল, প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণহীন ঘোড়া হতে দেওয়া যাবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র এটি দিয়ে মানুষকে দমন করার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেয়।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে হুথিদের অগ্রগতির ফলে নৌ-পরিবহন রুট হুমকিতে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তিনি উত্তেজনা হ্রাস ও আলোচনার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, আসুন, এই ঐতিহাসিক হল থেকে আমরা সবাই একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাই : যুদ্ধ এখনই থামাতে হবে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে। এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌচলাচলের স্বাধীন অধিকার পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে হবে।
জাতিসংঘের বেশ কিছু সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া ও অর্থায়ন হ্রাস করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক সমালোচক জাতিসংঘকে অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর বলে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রক্রিয়াগুলো চরম চাপের মুখে রয়েছে। আমাদের বৈশ্বিক সংস্থাগুলো এখনও অতীতের পুরোনো ক্ষমতার বাস্তবতা ও স্বার্থকে ধারণ করে চলেছে।
ভাষণের শেষভাগে গত ১০ বছর ধরে পাশে থাকা বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান গুতেরেস। অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আগামী ১ জানুয়ারি যখন আমি আর মহাসচিব থাকব না, তখন এই বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন : আমি যেখানেই থাকি না কেন, যাই করি না কেন; শান্তি যে সম্ভব, সেই বিশ্বাসের পক্ষে আমি আজীবন লড়ে যাব।
তিনি বলেন, আমি জাতিসংঘের সনদের মূল মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে যাব এবং আমি কখনোই, কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়ব না। সবাইকে ধন্যবাদ।
সূত্র: রয়টার্স

