মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে নেপাল, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমেধসে মৃত বেড়ে ৬৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে।

নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে। নেপালি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার মানুষকে।

আরো বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এখন কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষে প্রায় পুরোপুরি ঢেকে গেছে। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে দেশটির কয়েক হাজার পরিবার।

এদিকে তিব্বতে সাতজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে চীন।

নেপালে ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ।

অপরদিকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হতে থাকায় সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

বন্যার উৎপত্তিস্থল রসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো এখন নুয়াকোট ছাড়া আরও ভাটি অঞ্চল চিতওয়ান, তনহুন, নবলপরাসীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে। নুয়াকোট, ধাদিং ও নবলপরাসী জেলার হাসপাতালের মর্গগুলোয় ইতিমধ্যে লাশ রাখার জায়গা ফুরিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কিছু মরদেহ পাশের জেলাগুলোয় পাঠাতে হচ্ছে। পোখরা জেলার হাসপাতালগুলোও জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলা থেকে লাগাতার লাশ আসতে থাকায় তাদের মর্গগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা স্থানীয় হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিতওয়ানের ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মর্গ গড়ে তুলছে প্রশাসন। ভরতপুর মহানগরীর বিদ্যুৎ রোডের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’–এর একটি পরিত্যক্ত ভবনকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গত বৃহস্পতিবার চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও) গণেশ আরিয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিডিও গণেশ আরিয়াল জানান, চিতওয়ানের সব কটি হাসপাতালের মর্গ মিলিয়ে বড়জোর ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ একসঙ্গে রাখা সম্ভব। সেই ধারণক্ষমতার ওপর ইতিমধ্যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হওয়ায় নতুন এই অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি লাশ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যদি এই ধারণক্ষমতাও পেরিয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

ভরতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ এই অস্থায়ী ভবনটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছে। লাশগুলো যাতে পচে না যায়, সে জন্য ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বসানো হচ্ছে এবং ড্রাই আইস ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিতওয়ানের বিভিন্ন শিল্প ও বণিক সমিতি এই জরুরি ড্রাই আইস সরবরাহের খরচ ও দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার যখন কর্মীরা ভরতপুরের পরিত্যক্ত ভবনটিকে অস্থায়ী মর্গে রূপান্তরের কাজ করছিলেন, তখনো সেখানে নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য জানতে ভিড় জমান স্বজনেরা।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তাঁবুর ছায়ায় বসে অপেক্ষা করছিলেন ইয়ামান বানু নামের এক নারী। বন্যার পর নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারে তাঁর দাদি ও নানি নিখোঁজ হন। ইয়ামান জানান, তাঁর দাদি সাকলা ও নানি নাজাবুন নিশাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একইভাবে নিখোঁজ রয়েছেন গোরখার পালুংটার এলাকার মায়া বানিয়া খাড়কা নামের এক নারী। তিনি গোসাইকুন্ডায় তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। চিতওয়ানের বিজয়নগরে বাসিন্দা তাঁর দুই ভাই কৃষ্ণ বাহাদুর ও হরি বানিয়া বোনের একটি ছবি হাতে নিয়ে ভরতপুরের এই অস্থায়ী কেন্দ্রে ছুটে এসেছেন।

অস্থায়ী এই মর্গে লাশ সংরক্ষণের পুরো প্রস্তুতি এখনো শেষ না হলেও সকাল থেকেই স্বজনদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। নিখোঁজদের স্বজনেরা আশা করছেন, কেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ হলে তাঁরা অন্তত নিশ্চিত হতে পারবেন যে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাঁদের প্রিয় কোনো মানুষ রয়েছেন কি না।

পুলিশ সুপার নবীন কার্কি বলেন, ‘আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। যদি কোনো লাশের স্বজনদের খুঁজে না পাওয়া যায় কিংবা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না-ও হয়, তাহলে আমরা এগুলোকে মর্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেখে দিতে পারব না।’ –

সূত্র : বিবিসি ও কাঠমান্ডু পোস্ট

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন