কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে অনিশ্চয়তার মুখে দেশের জুটপ্রেসগুলো

একরামুল হোসেন লিপু

সোনালী আঁশখ্যাত কাঁচাপাট রপ্তানির মাধ্যমে শত বছর ধরে দেশের অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একসময়ে বিশ্বের ৪৭ টি দেশে কাঁচাপাট রপ্তানি হত। বর্তমানে এর সংখ্যা নেমে এসেছে ৮/১০ টি দেশে। স্বাধীনতার আগে এবং পরে রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও ফরিদপুর অঞ্চলে অসংখ্য জুট প্রেস স্থাপিত হয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারের ভ্রান্ত নীতির প্রভাবে ব্যাবসায়িক মন্দায় ইতোমধ্যে অনেক জুট প্রেস বন্ধ হয়ে গেছে। শত প্রতিকূলতায় টিকে আছে ৪০ টি’র মতো জুটপ্রেস। যেখানে লক্ষাধিক শ্রমিক এবং প্রায় ২০ হাজার কর্মচারী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু হঠাৎ করে রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় গত এক বছরে এ সকল শ্রমিক, কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে। চিকিৎসার অভাবে অনেকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

অন্যদিকে প্রেস মালিকরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ঋণগ্রস্ত এবং দেউলিয়া হয়ে পথে বসার আশঙ্কায় হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। রপ্তানির উপর থেকে অচিরেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে জুট প্রেসগুলো দেউলিয়া হবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দৌলতপুর খুলনা জুটপ্রেস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আখতার হোসেন ফিরোজ।

খুলনা গেজেটকে তিনি বলেন, ‘এককালে দৌলতপুর ছিল দেশের কাঁচা পাট রপ্তানির মূল কেন্দ্র। দৌলতপুরকে বলা হতো প্রাচ্যের ড্যান্ডি। স্বাধীনতার আগে এবং পরে খুলনার রেলিগেট থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত ভৈরব নদীর কূল ঘেঁষে ১০/১২ টি জুট প্রেস স্থাপিত হয়। প্রেসগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। পাট রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ অঞ্চলের শ্রমিক, কর্মচারী, রপ্তানিকারক, প্রেস মালিক, পাট চাষী, আড়তদার, মজুদদার, ব্যবসায়ী সবার মাঝে প্রাণচাঞ্চল্যতা ছিল। মুখে ছিল হাসি। দেশ স্বাধীনের পরেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ৩৫/৪০ লাখ বেল পাট রপ্তানি হতো। তার বুনিয়াদে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর অন্তবর্তীকালীন সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হঠাৎ করে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দৌলতপুরসহ সারা দেশে পাট রপ্তানির সাথে জড়িত লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। এখন তারা খেয়ে, না খেয়ে দিনাতিপাত করছে। একই সঙ্গে প্রেস চলুক, বা না চলুক মালিকদের সরকারি খাজনা, সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স, জমির খাজনা, বিদ্যুৎ বিল, দারোয়ান, কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ৪/৫ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে’।

তিনি বলেন, ‘এক একটা জুটপ্রেস তিন একর থেকে শুরু করে ১৫ একর জায়গা নিয়ে স্থাপিত। সেখানে ওয়্যার হাউস, মেশিনারিজ স্থাপন, সুপার কন্সট্রাকশন করা হয়েছে। প্রতিটা প্রেসে কমপক্ষে ৫০/৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। এই মুহূর্তে প্রেস মালিকরা খুবই কষ্টের ভিতর আছে। আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছি। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে’।

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯০ সালে তিন একর জায়গার উপর ইউনাইটেড জুটপ্রেস নামে আমার এই প্রতিষ্ঠানটি তিলে তিলে স্থাপন করি। কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করেছি। সেখানে সহস্রাধিক শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। গত এক বছর পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, জমির খাজনা, সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। প্রেসের যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাঁচা পাট যদি রপ্তানি বন্ধ থাকে, তাহলে বিদেশি বায়াররা তাদের ব্যবসা পরিবর্তন করবে। মিলের কাঠামো পরিবর্তন করে অন্য কোন ফ্যাক্টরি স্থাপন করবে। তখন সরকার এক্সপোর্ট করার অনুমতি দিলেও বিক্রি করার কাস্টমার পাওয়া যাবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ, দেশের কৃষক, শ্রমিক। এজন্য অতি দ্রুত দেশের স্বার্থে, পাট চাষি, শ্রমিক প্রেস মালিকদের স্বার্থে কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে, এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের মতো দৌলতপুরের ৮ টি জুট প্রেসসহ সারাদেশের জুটপ্রেসগুলো বিলীন হয়ে যাবে’।

তিনি বলেন, ‘এবছর বৃষ্টি এবং রোদ অনুকূলে থাকায় পাটের বাফার স্টক হয়েছে। বর্তমানে পাটের মূল্য সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে। কৃষক দুশ্চিন্তায় আছে, সঠিক মূল্য নিয়ে। পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। এ কারণে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম দাম থাকলে কৃষকরা পাট উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবে। এবছর যে পাট উৎপাদন হয়েছে তাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ৩০/৩৫ লাখ বেল পাট রপ্তানি করতে পারবে’। তিনি কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারী, আড়ৎদার, মজুমদার, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, প্রেস মালিকদের কথা বিবেচনা করে কাঁচাপাট রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন