নিজের স্বপ্ন, পরিবার ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে বড় গাড়ির চালকের আসনে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন ফুলতলার সুপ্রিয়া কুন্ডু। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করলেই বড় চাকরি করতে হবে এমন কথায় বিশ্বাসী না হয়ে এমবিএ পাশ করে চালাচ্ছেন তিনি বিআরটিসির ডাবল ডেকার পিংক মহিলা বাস। নানা সংগ্রাম ও বাধা পেরিয়ে একসময় শখের বশে শেখা ড্রাইভিং পেশা হিসেবে নিয়েছেন সুপ্রিয়া। নারীদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারাকে নিজের কাজের সবচেয়ে বড় আনন্দ ও গর্ব মনে করেন তিনি।
সুপ্রিয়া কুন্ডু বলেন, আমার শৈশব কেটেছে পরিবারে ভালোবাসায়। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা। বাবা-মা’ই ছিলেন আমার আদর্শ। ছোটোবেলা থেকেই পরিবারের সবাই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। তবে ১৬ বছর আগে বাবাকে হারানোর পর শুরু হয় জীবনে নতুন সংগ্রাম। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যায়। খুলনার আজম খান কমার্স কলেজ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেছি।
তিনি বলেন, খুলনা টিটিসির মিলন স্যারের কাছে আমার ড্রাইভিং শেখার হাতেখড়ি। পরে বিআরটিসির একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাইভেটকার চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রথমদিকে শখের বশেই গাড়ি চালানো শিখলেও পরবর্তী সময়ে ড্রাইভিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। বিআরটিসিতে বড় গাড়ি চালানো এবং শেখানোর সুযোগ আসে রাজু মোল্লা স্যারের মাধ্যমে। তার আহ্বানে চাকরিতে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে বড় গাড়ি চালাতে আরও বেশি দক্ষতা অর্জন করি। কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী ও প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সহযোগিতাও আমাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমবার বাস নিয়ে রাস্তায় নামার অভিজ্ঞতা ছিল আমার কাছে একেবারেই ভিন্ন। একসাথে এতজন যাত্রী নিয়ে বাস চালানোর দায়িত্ব আমার জন্য যেমন চ্যালেঞ্জের ছিল, তেমনি ছিল আনন্দেরও। প্রশিক্ষণের সময় মিরপুর, কল্যাণপুর ও গাবতলীসহ বিভিন্ন সড়কে বাস চালিয়েছি। প্রথম দিন বাস নিয়ে রাস্তায় বের হলে অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়েছেন, কেউ কেউ ভিডিও করেছে। তবে সতর্কতার সাথে সব পরিস্থিতি সামলে নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। একজন নারী চালক হিসেবে নারী যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারাটাই আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দ ও গর্বের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকেও সবসময় সহযোগিতা পেয়েছি। রাস্তায় একজন নারীকে বাস চালাতে দেখে অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন, কেউ কেউ স্যালুটও করেছে। মানুষের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। বাস চালাতে গিয়ে শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোথাও রাস্তার গর্ত, কোথাও রাস্তার পাশে উঁচু গাছ, আবার কোথাও অনুপযোগী যানবাহনের কারণে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে ট্রাফিক সার্জেন্টদের সহযোগিতা পেয়েছি সবসময়। কোনো সমস্যায় পড়লে তাদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে।
সুপ্রিয়া বলেন, পথচলায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার পরিবারের। প্রশিক্ষণের সময় আমার মা ও বড় বোন আমাকে মানসিকভাবে সহযোগিতা করেছে। মেজো বোন ও ভাই অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বন্ধু, শিক্ষক ও আত্মীয়-স্বজনের উৎসাহও আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাস চালানোর ভিডিও প্রকাশ করলে পরিচিতজনদের ইতিবাচক মন্তব্য ও উৎসাহ আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও বিআরটিসির সাথে কাজ করে যেতে চান। বিআরটিসি আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, আমার পেছনে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেছে এবং বাস চালানোর সুযোগ দিয়েছে। এখন আমার নিজের কাজের মাধ্যমে সেই আস্থার প্রতিদান দিতে চাই। বিআরটিসিকে আমি পরিবারের মতো মনে করি। বিআরটিসি নারী চালকদের সমস্যাগুলো বিবেচনা করে দ্রুত সমাধানের করবে এটাই প্রত্যাশা করি।
অন্য নারীদের উদ্দেশে আমার বার্তা ঘরে বসে থাকলে পরিবর্তন আসবে না। নিজের দক্ষতা তৈরি করে নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আনন্দ ও শান্তি অন্য কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। আমি মনে করি, বর্তমান সময়ে নারী-পুরুষ সবারই নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। তাই নারীদের কোনো না কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ড্রাইভিং শেখা দরকার। নিজের প্রয়োজনে কিংবা জরুরি মুহূর্তে যেন একজন নারী নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে পারে।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে পিংক মহিলা বাস চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করায় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।
সুপ্রিয়ার মা বলেন, প্রথমে একটু চিন্তা হলেও ওর সিদ্ধান্তকে আমরা মেনে নিয়েছি। ওর সাহস দেখে আমার ভালো লাগে। ও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য মেয়েদের সাহস জোগাচ্ছে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় গর্ব।
বিআরটিসির ম্যানেজার মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, সুপ্রিয়া অনেক দিন ধরেই বিআরটিসির সাথে যুক্ত ছিলেন। চালক হিসেবে তার দক্ষতা যথেষ্ট ভালো ছিল। বিশেষ করে একজন নারী চালক হিসেবে তার দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। একই সাথে তিনি একজন দক্ষ প্রশিক্ষকও ছিলেন। নারী চালকদের জন্য বিআরটিসিতে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নারী প্রশিক্ষণার্থীদের সুবিধার্থে নারী প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়। বর্তমানে আমরা আরও ২০০ জন নারী প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
খুলনা গেজেট/এনএম

