ভারতের স্বাধীনতা : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির আট দশক

মজিবুর রহমান

আমাদের প্রিয় দেশ ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন চলছে। এই উপলক্ষে আমরা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতি আলোকপাত করছি। আমরা আমাদের হৃদয়ের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করছি তাঁদের প্রতি, যাঁরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-ব্রিটিশ সরকারের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন, ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন অথবা কারাগারে বন্দি থেকেছেন। এরই সঙ্গে স্বাধীন ভারতে আমরা আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি তথা সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও আলোচনা করছি। বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় দ্বিতীয়টি।

স্বাধীন ভারতের সাফল্যের সূচনা হয় তার সংবিধান রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যে সংবিধান কার্যকর হয়, তা যেমন বিশ্বের বৃহত্তম সংবিধান হিসেবে স্বীকৃতি পায় তেমনি ভারতকেও বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা এনে দেয়। ১৯৫২ সালে অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সাধারণ নির্বাচন। সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রবর্তিত হয়। কেন্দ্রে এবং সকল অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠিত হয়। সামান্য ব্যতিক্রম ও বিচ্যুতি ছাড়া যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ফলে দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সংসদীয় শাসনব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিগত আট দশকে একবারের জন্যেও দেশবাসীকে সামরিক শাসনের সম্মুখীন হতে হয়নি। অথচ ভারত ভেঙে সৃষ্ট পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।

ভারত মোটের ওপর একটি শান্তিকামী রাষ্ট্র। তবে ভারতকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে একবার (১৯৬২) এবং পাকিস্তানের সঙ্গে চারবার (১৯৪৭,১৯৬৫,১৯৭১,১৯৯৯) যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। যুদ্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই দুই দেশের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া ছাড়াও ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র। সামরিক খাতে বার্ষিক বরাদ্দে ভারতের স্থান তৃতীয়। প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল বরাদ্দ দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়ণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মহাকাশ বিজ্ঞানে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো দুর্দান্ত কাজ করছে। ইসরোই প্রথম চাঁদে জলের অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছে। তারা প্রথম প্রচেষ্টাতেই মঙ্গলের কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনে সফল হয়েছে। মহাকাশ বিজ্ঞানে সাফল্যের সুবাদে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ তৈরির কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে।

ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের জীবিকা হলো কৃষিকাজ। গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অনেক কৃষিজ পণ্য আমাদের আমদানি করতে হতো। এখন অবস্থা পাল্টেছে। দেশে সবুজ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। দেশ কৃষিতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। জিডিপি’র ১৮ শতাংশ আসছে কৃষি খাত থেকে। কিন্তু দেশের কৃষিকাজের সাথে যুক্ত সাধারণ শ্রমিক তথা প্রান্তিক চাষীদের অবস্থা খুব খারাপ। তাঁরা ফসল ফলান কিন্তু তাঁদের নিয়মিত দু-মুঠো আহারের নিশ্চয়তা থাকে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নামমাত্র বা নমিনাল জিডিপি’র হিসেবে ভারতের অর্থনীতি ষষ্ঠ বৃহত্তম। তবে ক্রয় ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি’র(পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) দিক থেকে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। অর্থনীতির এই উন্নতি সত্ত্বেও ভারতের এক-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ১৯৪৭ সালে এক ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৩ টাকা ৩৩ পয়সা আর এখন ৮১ টাকা। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭০ সালে এক লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ১ টাকা ১৮ পয়সা, এখন সেঞ্চুরি পার করে গেছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে নোট বন্দি বা ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘটনা ভারতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

স্বাধীনতার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ১৯৪৭ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ১২ শতাংশ, এখন যা ৭৮ শতাংশ। ব্রিটিশ ভারতে কোনো প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে দেশে ২৩টি আইআইটি রয়েছে। প্রচুর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কেজি থেকে পিজি পর্যন্ত শিক্ষার বেসরকারিকরণ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা জোগানো হচ্ছে। শিক্ষাকে পণ্য করে তোলা হচ্ছে। স্কুল ছুট বাড়ছে। অ্যাকাডেমিক শপিং মলে নিম্নবিত্তদের প্রবেশাধিকার থাকছে না।

১৯৪৭ সালে ভারতবাসীর গড় আয়ু ছিল ৩২ বছর। এখন হয়েছে ৭০। ভারতে বর্তমান ডাক্তার-জনসংখ্যা অনুপাত হল ১:৮১১, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ১:১০০০ অনুপাতের আদর্শ মানকে অতিক্রম করেছে। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এরপরও বাস্তব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সন্তোষজনক বলা যায় না। মানুষের রোগ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষকে নাজেহাল হতে হচ্ছে। ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর নার্সিংহোমের বিল মেটাতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। একটুখানি কঠিন অসুখ হলেই মানুষ বিভ্রান্তির কবলে পড়ছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর হার বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
ভারত আয়তনে সপ্তম বৃহত্তম দেশ হলেও জনসংখ্যায় এখন এক নম্বরে। এদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ তথা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে কখনও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়নি। বিপুল জনসংখ্যাকে বিপুল জনসম্পদে পরিণত করার কথাও ভাবা হয়নি। এই মুহূর্তে বেকারত্বের হার সাড়ে পাঁচ শতাংশ। কিন্তু শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বেকারত্বের ভয়াবহতাকে উপলব্ধি করা যাবে না। দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা কমছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মী হিসেবে নিযুক্ত হতে চেয়ে মাস্টার ডিগ্রি হোল্ডাররা আবেদন করছেন! যার কলম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার কথা তাকে সস্তার শ্রমিক হিসেবে গতর খাটিয়ে খেতে হয়! কর্মসংস্থানের প্রশ্নে করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভারতে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যেও কখনও কখনও স্বৈরশাসনের পদধ্বনি শোনা যায়। ১৯৭৫-এর জুন থেকে ১৯৭৭-এর মার্চ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা ছিল তেমনই একটি ঘটনা। সম্প্রতি অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি হতে দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দিয়ে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের হয়রান ও হেনস্তা করা হচ্ছে। বিরোধী কণ্ঠস্বরকে জব্দ করতে নিত্যনতুন আইন রচনা করা হচ্ছে। সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতার সমকক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল প্রবাহের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম বশ্যতা স্বীকার করে সরকার বা শাসকদলের প্রচারকে পরিণত হয়েছে। তারা বিকৃত অথবা বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করছে। এ বছর বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। গত বছর ছিল ১৫১তম।

ভারতীয় রাজনীতিতে একসময় প্রচুর উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানী গুণী, বিশিষ্ট ব্যক্তি নেতানেত্রী, সাংসদ, বিধায়ক থেকেছেন। এখন এক্ষেত্রে একটা স্পষ্ট অবনমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নন ম্যাট্রিক, স্বাক্ষর করতে জানে না, শপথ বাক্য পাঠ করতে পারে না এমন লোকেরা রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করছে। এর ফলে রাজনীতি দুর্বৃত্তদের আখড়া হয়ে উঠেছে।

স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ছিল আত্মত্যাগের ক্ষেত্র। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর নেশা। ব্যাবসাবাণিজ্য কিংবা চাকরিবাকরির মাধ্যমে পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধির পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে রাজনীতিকরা দেশের জন্য কাজ করতে চাইতেন। ত্যাগেই তৃপ্তি ছিল। দুর্নীতির কোনো বালাই ছিল না। এখন অনেকের কাছেই রাজনীতি করার উদ্দেশ্যটাই পাল্টে গেছে। রাজনীতি হয়ে গেছে প্রচুর অর্থ উপার্জনের একটা বাণিজ্যিক প্রকরণ। রাজনীতি ও দুর্নীতি প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে গবাদিপশুর ঘাস খাওয়ার মতোই প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ঘুস খায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতে দুর্নীতির সামাজিকীকরণ ঘটে গেছে।

বিগত এক দেড় দশকে রাজনীতিতে যেভাবে দলবদলের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে তাতে রাজনীতিকে এখন আর ‘নীতির রাজা’ বলা যায় না। রাজনীতি এখন আর কোনো মতাদর্শগত লড়াইয়ের জায়গা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্লাবে এবং রাজনীতিকরা খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে। এরা যখন যে দলে গেলে আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা বেশি মিলবে তখন সেই দলে চলে যাচ্ছে। রাজনীতিকদের গায়ের চামড়া এত মোটা হয়েছে যে, বেইমান, বিশ্বাসঘাতক, বিভীষণ, মীর জাফর, গদ্দার– কোনো গালমন্দেই এরা আর লজ্জিত হয় না।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। ভারত থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হয়েছে। কিন্তু ৮০ শতাংশ হিন্দু এবং ২০ শতাংশ অহিন্দু নিয়ে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই অবস্থানকে পাল্টে ফেলতে বরাবরই সক্রিয় থেকেছে কতিপয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। তারা বিভিন্নভাবে ভারতের বহুত্ববাদী ভাবধারাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। তারাই এখন কেন্দ্রে এবং অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে। সরকারের মদদে দেশজুড়ে ধর্মের নামে বিভাজন বাড়ছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হচ্ছে। উগ্রবাদীরা এখন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি, শক্তি ও সংগঠনকে ‘সেকু মাকু’ বলে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করছে না। ধর্মীয় মৌলবাদ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিবাদী বক্তব্য প্রচার করার ‘অপরাধে’ গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকার, এম এম কালবুর্গী, গৌরী লঙ্কেশ প্রমুখ স্বাধীনচেতা ও মুক্তমনা ব্যক্তিরা নিহত হয়েছেন।

ভারত একটি বৈচিত্র্যময় বিশাল দেশ। এদেশে বহু পরস্পর বিরোধী ভাবধারা একসাথে চলতে পারে। অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকে, সংঘাত হয়। কখনও সত্যের জয় হয়, কখনও মিথ্যা জেতে। দেশ কখনও এগোয়, কখনও পিছিয়ে পড়ে। সাফল্য–ব্যর্থতা হাত ধরাধরি করে চলে। দিনের শেষে প্রতিটি ভারতবাসীই বলে,‘মেরা ভারত মহান।’

লেখক : মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘি থানার কাবিলপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন