উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ, বসানো হচ্ছে পুলিশি চেকপোস্ট

যশোরে প্রশ্নবিদ্ধ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর

যশোরে প্রশ্নবিদ্ধ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছিনতাই, চুরি ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে অহরহ। শহরের আদালত চত্বর থেকে চালককে অচেতন করে ইজিবাইক ছিনতাই, পাগলাদাহ এলাকায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও নগদ টাকা-মোবাইল ছিনতাই এবং মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সূত্র জানায়, অপরাধপ্রবণ জেলা হিসেবে যশোরের পরিচিতি দেশব্যাপী রয়েছে। এক সময়ে যশোরে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও বোমাবাজি নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। এ জেলার নাম শুনলেই বাইরের অনেক মানুষই বিগত দিনে আঁতকে উঠতেন। শহরতলির অন্যতম চিহ্নিত ছিনতাই স্পট মণিরামপুর সড়কের রামনগরের কানাইতলায় এখন আর ছিনতাই হয় না। সেখানে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও হোটেল রেস্তোরাঁ। যদিও সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। দিন বদলের পালায় যশোর জেলাও ভালো তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

কিন্তু তারপরও যশোরের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ হচ্ছে, জেলাজুড়ে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই ও ইজিবাইক ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছুরি, চাকু ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার ও প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটছে। কিশোর গ্যাংয়ের হাতে হাতে মিলছে বার্মিজ চাকুসহ ধারালো অস্ত্র।

এদিকে, গত ১৫ জুলাই যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলা ইউনিয়নের বাউশা গ্রামের বেতনা নদীর তীর থেকে সাখাওয়াত হোসেন সাকা (৬০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয়রা জানায়, তিনি একসময়ের আলোচিত ‘সাখা বাহিনীর’ প্রধান ছিলেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া হাসান বলেন, গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ উপজেলার বেতনা নদীর পাড় থেকে সাখাওয়াত হোসেন সাকার মরদেহ উদ্ধার করেছে। নিহত ব্যক্তি ওই এলাকার একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন এবং তাঁর নামে গড়ে ওঠা বাহিনীটি পুরো উপজেলায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাত।

এর আগে যশোর শহরের আদালত চত্বর থেকে চালককে অচেতন করে তার ইজিবাইক নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী বাবর আলী (৬২) কেশবপুর উপজেলার ত্রিমোহনী ইউনিয়নের ত্রিমোহনী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় ছিলেন ইজিবাইক চালক। স্থানীয় লোকজন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে জেনারেল হাসপাতালের ভর্তি করে। চোরেরা তাকে অচেতন করে ইজিবাইক টি নিয়ে পালিয়ে যায়।

এদিকে, গত ১ এপ্রিল যশোরের কেশবপুরের পল্লিতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। যদিও পরে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় এক এসআইসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওইদিন গভীর রাতে কেশবপুর উপজেলার বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের হিজলডাঙ্গা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

তিনটি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করতে কেশবপুরে অভিযান চালায় পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় একটি মসজিদের মাইকে ‘পুলিশ আসামিকে মেরে ফেলেছে’ এমন মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর মুহূর্তেই ৫০/৬০ জন লোক জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পলাতক আসামি জাহাঙ্গীর আলমকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ১৭ মে যশোরের অভয়নগর উপজেলায় এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। যার বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ছিনতাইসহ ছয়টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়।

গত ২৭ জুন যশোর-নড়াইল সড়কের দাইতলা হামকুড়া ব্রিজের কাছে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে পারভেজ (৩৫) নামে এক ভ্যানচালক গুরুতর আহত হন। এ সময় দুর্বৃত্তরা তার ভ্যান, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তিনি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা খানপুর গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে।

এসব ঘটনায় বর্তমানে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। তারা মোবাইল টিম ও তল্লাশি চৌকি বাড়িয়েছেন। ইতোমধ্যে পুলিশ ছিনতাইকারী চক্রের ৬ জনকে আটক করেছে। তারা হলো, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার গালিমপুর গ্রামের রুস্তম আলীর ছেলে মাসুদুর রহমান, মুনছের আলী মন্ডলের ছেলে তোফাজ্জেল হোসেন তোফা, মৃত সিদ্দিক রহমানের ছেলে মোবারক হোসেন, ছলেমানপুর গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে মুকতার হোসেন, মহেশপুর উপজেলার বজরাপুর এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে আলমগীর হোসেন এবং চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের মৃত জলিলের ছেলে সাকিল হোসেন।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মেদিনিপুর গ্রামের মাহাবুব হোসেনের (৬৫) ইজিবাইকে গত ৬ জুন রাত ৯টার দিকে চৌগাছার পুড়াপাড়া বাজার থেকে দুই ব্যক্তি যাত্রীবেশে তার গাড়িতে ওঠেন। পরে যশোর শহরের পালবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে আরও দুই ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা আব্দুলপুর রেলক্রসিং অতিক্রম করে হুজুরপাড়া এলাকায় পৌঁছালে মাহাবুব হোসেনের ওপর হামলা চালায়। তারা ছুরির ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে নগদ ১ হাজার ২০০ টাকা, একটি মোবাইল ফোন এবং ইজিবাইক ছিনিয়ে নেয়। পরে তাকে মারধর করে ফেলে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ মামলার পরে অভিযান চালিয়ে ওই ৬ জনকে আটক করা হয়।

একইসাথে প্রতিদিন রাত ১২টা নাগাদ কেউ রিকশায় একা থাকলে তার পাশে জোর করে উঠে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা। সম্প্রতি শহরের দড়াটানা মোড়ে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে।

এসব বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম বলেন, “যশোরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ বিভাগ বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।” তিনি বলেন, “সপ্তাহে দুইদিন সারারাত তিনি চেকপোস্টগুলো তদারকির অভিযান চালান।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন