জলাবদ্ধতা নিরসনে কেসিসি’র হাজার কোটি টাকা ব্যয়, নেই সুফল

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সাল থেকে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়। ময়ূর ও হাতিয়া নদীসহ খনন করা হয় ৫টি খাল। নগরীর ভেতরে ও বাইরের ১১টি খালকে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ‘নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে তখন খরচ করা হয়েছিল প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। কিন্তু বছর ঘুরতেই বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে খুলনা মহানগরী।

এ অবস্থায় ২০১৮ সালে নেওয়া হয় খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প। এর ব্যয় ধরা হয় ৮২৩ কোটি টাকা। গত ৮ বছর এই প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদসহ সাতটি খাল খনন এবং ১৬৯টি ড্রেন পুনর্নির্মাণ করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। গত ৩০ জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৩৯ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নগরীর পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখনও ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে নগরীর নিম্নাঞ্চল। প্রধান সড়কে তৈরি হচ্ছে জলজট।

শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও জলাবদ্ধতা না কমায় সবার মাঝে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেন বিপুল অর্থ জলে গেল-তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছে নগরবাসী। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বিগত মেয়রের সময় হয়নি। জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য রূপসায় উচ্চক্ষমতার পাম্প স্টেশন বসানোর কথা ছিল। এ পর্যন্ত পাঁচ দফা পুনঃদরপত্র আহ্বান করেও সেই কাজ শুরু করা যায়নি। বাস্তুহারা খালের একাংশ পুরো ভরাট হয়ে আছে। সেটা কাটাই হয়নি। এসব কাজ শেষ না করলে প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাবে না।”

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, “চলতি বছর সবচেয়ে ভারী বৃষ্টি হয়েছে গত বুধবার। সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৩০ মিলিমিটার। এর আগে ১ জুলাই ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। তিন দিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে ছিল নগরীর অনেক সড়ক, বসতবাড়ির নিচতলা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

বৃষ্টি হলেই নিম্নাঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়া খুলনা নগরীর অনেক পুরোনো সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছেন নগরবাসী। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প নেয় কেসিসি। ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন হয় ‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’। এর মোট ব্যয় ছিল ৮২৩ কোটি টাকা। মেয়াদ রয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পের আওতায় ময়ূর ও খুদে নদসহ সাতটি খাল খনন করা হয়েছে। দুটি ড্রেনের কাজ বৃষ্টির কারণে বন্ধ রয়েছে। বাকি ১৬৭টি ড্রেনের কাজ পুরোপুরি শেষ। গত ৩০ জুনের প্রতিবেদনে প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৮৯ শতাংশ। খরচ দেখানো হয়েছে ৯০ শতাংশ।

গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় মুজগুন্নী, গোবরচাকা, লবণচরা, চানমারী, টুটপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেশির ভাগ সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা গেছে। মুজগুন্নী আবাসিকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে শোচনীয়। বি ব্লকের বাসিন্দা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “ড্রেনগুলোতে ঠিকমতো পানি অপসারণ হয় না। একটু মাঝারি বৃষ্টি হলেই সড়ক ডুবে যায়। বাড়ির নিচতলায় পানি উঠে যায়। পানির কারণে অধিকাংশ বাড়ির নিচতলার ভাড়াটিয়া চলে যাচ্ছে।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান বলেন, বাস্তুহারা খালের কিছু অংশ ভরাট হয়ে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সেটি কাটার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। রূপসায় পাম্প চালিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে ফেলা হয়েছে। অন্যান্য যে কোনো দিনের তুলনায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয়েছে।

জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ ড্রেনগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। পাম্প স্টেশনের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। পাম্প বসানো হয়ে গেলে জলজট অনেকটা কমে যাবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন