বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় রূপকথাকেও যেনো হার মানিয়েছে আর্জেন্টিনা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরেও যে অবিশ্বাস্য কামব্যাক করেছে তারা। তবে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর রেফারিং ও ভিএআরের দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছে মিসর।
মিশরের কোচের দাবি, আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে টিকিয়ে রাখতেই তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।
অন্যদিকে রেফারিকে ‘জালিম’ সম্বোধন করেছেন ফরোয়ার্ড জিকো। ক্ষোভের কারণ, একটি গোল বাতিল এবং পেনাল্টি না দেওয়ায়।
৫৮ মিনিটে মিশরকে দ্বিতীয় লিড এনে দিয়েছিলেন জিকো। কিন্তু ভিএআরে তার সেই গোল বাতিল হয়ে যায়।
গোল বাতিলের ব্যাখ্যায় রেফারি লেতেক্সিয়ে জানান, আক্রমণ শুরুর সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জার্সি টেনে ধরার সঙ্গে তার পায়ে বুটের আঘাত করেন মিশরের মারওয়ান আতিয়া।
গোল বাতিল হতেই প্রতিবাদ জানায় মিশর। তবে লাভ হয়নি। তা নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে স্যোশাল মিডিয়ায়।
বিষয়টিতে ফক্স স্পোর্টসের ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো ম্যাকনিক মনে করেন যে, যেহেতু এটি একটি ফাউল ছিল, তাই গোলটি বাতিল করা উচিত ছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘খেলার আক্রমণাত্মক পর্যায়ে করা কোনো ফাউলের ফলে যদি গোল হয় অথবা গোলদাতা দল বলের দখল পায়, তাহলে সেই গোলটি বাতিল হয়ে ফ্রি-কিক দেওয়া হতে পারে,’।
এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) নিয়ম ‘লজ অব দ্য গেম’ অনুযায়ী, পর্যালোচনাযোগ্য কোনো ঘটনার আগে বা পরে খেলার যে অংশটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিও ভিএআরে যেতে পারে।
এ ছাড়া, গোল হওয়ার আগে আক্রমণের শুরুর সময় যদি আক্রমণকারী দলের কোনো অপরাধ—যেমন হ্যান্ডবল, ফাউল বা অফসাইড ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রেও ভিএআরের মাধ্যমে সেই ঘটনা পর্যালোচনা করে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
ঘটনাটিকে দুঃখজনক হলেও রেফারি সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে জানান স্কটল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালি ম্যাকয়েস্ট।
আইটিভিকে তিনি বলেছেন, ‘এত সুন্দর গোল বাতিল হওয়ায় সত্যিই হতাশ হয়েছি। তবে গোলটি বাতিল করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত। সে (আক্রমণকারী) নিশ্চিতভাবেই প্রতিপক্ষের জার্সি টেনে ধরেছিল।’
অন্যদিকে ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস খুঁজে দেখেছেন কেন মিসরের গোল বাতিল করা হয়েছিল, কেন আর্জেন্টিনার গোল বহাল রাখা হয়েছে সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
তিনি মনে করেন সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল। এক যুগের বেশি রেফারির দায়িত্ব পালন করা ডেভিস বলেছেন, ‘ভিএআরের হস্তক্ষেপ সঠিক ছিল। সঙ্গে গোল বাতিলের সিদ্ধান্তও।
ভিএআর পর্যালোচনা নিয়ে ডেভিস ব্যখ্যা করেছেন এভাবে, ভিএআর-এর জন্য এটি একটি কঠিন ম্যাচ ছিল, কারণ মাঠের যে স্থানে ম্যাক অ্যালিস্টারের প্রাথমিক ঘটনাটি ঘটেছিল, তা একটি দ্বৈত পরিণতির অনন্য পরিস্থিতি তৈরি করেছিল — যেকোনো ইতিবাচক হস্তক্ষেপের ফলে একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার গোলটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তেমনই খেলার একই পর্যায়ে ঘটনাটি ঘটায় মাঠের বিপরীত প্রান্তে একটি পেনাল্টিও দেওয়া হতে পারত।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের তুলনামূলক তৎপরতা, যারা উভয় অ-সিদ্ধান্তই যাচাই করে বাতিল করে দিয়েছিলেন, তা বিবেচনা করে ভিএআর এই বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিল যে কোনোটিই হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেনি।
রায় সম্পর্কে বলেন, রেফারি এবং ভিএআর উভয়ের জন্যই ম্যাচের এই কঠিন সমাপ্তিতে, আমি নিশ্চিত যে তারা উভয় ক্ষেত্রেই সঠিক ছিলেন।
তিনি বলেন, বল ছাড়া অবস্থায় ফ্যাথির শার্ট ধরে ম্যাক অ্যালিস্টার একটি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তবে, এটি ছিল সামান্য, দীর্ঘস্থায়ী ছিল না এবং আক্রমণকারীর বলের দখল নেওয়ার ক্ষমতার উপর এর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। আমার মতে, এটি একটি গুরুতর ফাউল হোল্ড এবং পেনাল্টি কিকের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেনি।
ডেভিসের কাছে ‘সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন সালাহ। আলভারেজের দিক থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লাগে এবং তাদের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।’
একইভাবে সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক। ওই ঘটনায় সালাহ ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন। আলভারেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লাগে এবং দুজনের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।
দুই ফাউলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন
অনেকে শেষের ঘটনাটির সঙ্গে মিসরের বাতিল হওয়া গোলের আগে আত্তিয়ার ফাউলের তুলনা করতে পারেন। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
প্রথম ঘটনায় একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। কিন্তু সালাহর ঘটনায় দুজনের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা দুই খেলোয়াড়ের গতির ফল। তাই দুটি ঘটনা এক নয়।
খুলনা গেজেট/এনএম

