গোপালগঞ্জে পাট চাষে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল পাটের জাত ‘বিনা তোষাপাট- ১’। গোপালগঞ্জে চলতি মৌসুমে এই নতুন জাতের পাটের বাম্পার ফলন এবং মানসম্মত বীজ উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশেই এই জাতের পাটের বীজ উৎপাদন করলে একদিকে যেমন কমবে আমদানি নির্ভরতা, অন্যদিকে ভারতীয় বীজ কেনা বাবদ দেশের অন্তত ১শ’ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সুচিডাঙ্গা গ্রামের কৃষক সমীর মজুমদার বিগত কয়েক বছর ধরে বাজারে থেকে বীজ কিনে করেছিলেন পাটের চাষ। তবে সার, কীটনাশক ও সেচ দিয়েও সেসব বীজ থেকে আশানুরূপ ফলন পাননি তিনি। ফলে টানতে হয় লোকসানের বোঝা। তবে এবার বিনা উপকেন্দ্র গোপালগঞ্জের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে বিনা উপকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে পাটের বীজ নিয়ে নিজের তিন বিঘা জমিতে আবাদ করেন ‘বিনা তোষাপাট-১’। এ বছর তার জমির পাট হয়েছে ভালো। অন্যান্য জাতের তুলনায় ‘বিনা তোষাপাট- ১’ হয়েছে লম্বা আর আঁশও হয়েছে মোটা। ফলে এ বছর পাট বিক্রি করে লাভের আশা করছেন তিনি।
শুধু সমীর মজুমদার নয় তার মতো গোপীনাথপুর ইউনিয়নের সুচিডাঙ্গা গ্রামের ২৫জন কৃষক বিনা উপকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে পাটের বীজ নিয়ে রোপণ করছেন। ফলন ভালো হওয়ায় খুশি তারা।
গতকাল শনিবার বিকেলে সদর উপজেলার সুচিডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, এ গ্রামে পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ‘বিনা তোষাপাট- ১’। প্রচলিত অন্যান্য জাতের তুলায় ‘বিনা তোষাপাট- ১’ লম্বায় বেশি হবার পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ অনেক কম। এ জাতের আঁশের ফলন হেক্টর প্রতি ৩.২ টন থেকে প্রায় ৪ টন। এই পাটের জীবনকাল মাত্র ১০০ থেকে ১০৭ দিন হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে পারায় একই জমিতে চারটি ফলস করতে চাষ পারবেন।
প্রতি বছর তোষাপাটের বীজের জন্য একটি বড় অংশ পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়। এছাড়া সঠিক সময়ে মানসম্মত বীজ না পাওয়া এবং চড়া মূল্যের কারণে প্রায়শই প্রান্তিক কৃষকেরা লোকসানের মুখে পড়েন। ‘বিনা তোষাপাট- ১’ জাতের পাট থেকে হেক্টর প্রতি প্রায় ১ হাজার কেজি বীজ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই সাথে পাটের পাতার ক্লোরোফিল এর ঘনত্ব বেশি থাকায় এই জাতের পাটের আঁশ ও বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকরা অর্থিকভাবে লাভবান হবেন। কৃষকেরা যদি নিজেদের প্রয়োজনীয় বীজ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারেন, তবে বিদেশ থেকে পাটবীজ আমদানির আর প্রয়োজন হবে না।
গোপালগঞ্জে বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ‘বিনা তোষাপাট- ১’ এর চাষাবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বিনা উপকেন্দ্র গোপালগঞ্জ এ মাঠ দিবসের আয়োজন করে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সুচিডাঙ্গা গ্রামে অনুষ্ঠিত এ মাঠ দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোঃ মামুনুর রহমান। বিনা উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ হারুন অর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মাঠ দিবসে বিনা ময়মনসিংহের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফাহমিনা ইয়াসমীন, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ নুরুন-নবি মজুমদার, কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ হাবিবুর রহমান, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাফরোজা আক্তারসহ কৃষি কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।
বিনা উপকেন্দ্র, গোপালগঞ্জ এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বিনা তোষাপাট- ১’ জাত একটি উচ্চ ফলনশীল জাত। ৫২ শতাংশের বিঘায় অন্যান্য জাতের থেকে ৪ থেকে ৫ মন ফলন বেশি হয়। গাছটি লম্বা হয় ও পাতা সবুজ থাকে। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা কৃষকদের ‘বিনা তোষাপাট- ১’ জাত চাষে পরামর্শ দিচ্ছি। ফলে আমরা কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করেছি। এ জাতের পাটের জীবনকাল মাত্র ১০০ থেকে ১০৭ দিন। ফলে কৃষকরা তাদের ফসল আগাম ঘরে তুলতে পারবেন, সেই সাথে একই জমিতে আরো ৪টি ফসল করতে পারবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

