সোমবার । ১১ই মে, ২০২৬ । ২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩
নেপথ্যে শত্রুতা নাকি বাস্তবে সখ্যতা?

মুক্তিপণ দিয়ে আসা মৌয়ালদের বর্ণনায় জনপ্রতিনিধির নাম

তরিকুল ইসলাম

সুন্দরবনের দস্যুর থাবায় সব হারিয়ে বাড়ি ফেরা কয়রার মৌয়ালরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে। অগ্রিম চাঁদা দিয়ে ‘টোকেন’ সংগ্রহ না করে ফের মধু সংগ্রহে গেলে তাদের জীবনের শঙ্কা রয়েছে। দাদন নিয়ে মধু সংগ্রহে যাওয়ার পরে বনদস্যুরা তাদের নগদ টাকা, জামাকাপড় ও মধু আহরণের সরঞ্জামাদি ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি থেকে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করেছে বলে জানান তারা।

গতকাল রবিবার বিকেলে কয়রা প্রেসক্লাবের নিজস্ব কার্যালয়ে এসে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে দস্যুদের মুক্তিপণ নেওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন ১৩ মৌয়াল।

এসময় মৌয়ালদের ভাষ্যে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হাসানের সঙ্গে দস্যুদের সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে। তবে অস্বীকার করে আবুল হাসান জানান, দস্যু দলের এক সদস্যের শ্বশুরের সাথে তার ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলে তাকে দমন করতে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।

মৌয়ালরা জানান, ‘গত বৃহস্পতিবার সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে দু’টি নৌকায় করে মধু আহরণের উদ্দেশ্যে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন ১৩ জন মৌয়াল। বিকেল ৫টার দিকে শিবসা নদীসংলগ্ন কুমড়াখালী খালে পৌঁছালে বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’ তাদের নৌকা ঘিরে ফেলে। পরে তাদের সুন্দরবনের গহীনে নিয়ে দু’দিন আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। দস্যু দলের কাছে চারটি বন্দুক, দু’টি পাইপগান, একটা রাইফেলসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল। সংখ্যায় তারা ২৮ থেকে ৩০ জন ছিলেন।’

মৌয়ালদের অভিযোগ, এ সময় বনদস্যুরা তাদের কাছে থাকা ৪২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং মধু সংগ্রহের সব সরঞ্জাম নষ্ট করে দেয়। পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দেনদরবারের একপর্যায়ে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা পাঠানোর পর শনিবার বিকেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ওইদিন রাতে তারা বাড়ি ফেরেন।

মৌয়াল দলের সর্দার আব্দুল গফুর গাজী বলেছেন, ‘এক হাজার টাকায় দুইশ’ গ্রাম মধু দেওয়ার শর্তে ঋণ নিয়ে মধু কাটতে গিয়েছিলাম। ডাকাতরা সব কেড়ে নিয়েছে। এখন কী খাবো আর পাওনাদারদের টাকা কীভাবে শোধ করবো এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।’

মৌয়াল দলের সদস্য হারুন গাজী জানান, বনদস্যুরা আটকে রেখে তাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে বলে, ‘তোদের খবর আছে। তোরা হাসান মেম্বরের কাছে টাকা না দিয়ে কেন বনে ঢুকেছিস? তার কাছে জনপ্রতি মাত্র চার হাজার টাকা দিলে তো তোদের আটকাতাম না।’ তার দাবি, আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হাসান ওরফে হাসান মেম্বরের সাথে বনদস্যুদের যোগসূত্র রয়েছে।

আরেক মৌয়াল খোকন মণ্ডল বলেন, ‘আমরা আগে জানতাম না হাসান মেম্বর দস্যুদের সঙ্গে জড়িত। দস্যুদের কাছে জিম্মি হওয়ার পরে তাদের মুখে শুনেছি, অস্ত্র কেনার জন্য বনদস্যুদের সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছে। বনে ঢুকতে হলে তার কাছ থেকে টোকেন নিতে হবে।’

প্রায় ৩৫ বছর ধরে বনে যাওয়া পরিমল সরকার বলেছেন, ‘ছোটোকাল থেকে বনে যাই। বন থেকে মাছ-কাঁকড়া ধরে, মধু সংগ্রহ করে কিংবা গোলপাতা কেটে আমরা সংসার চালাই। এমন বিপদে কখনও পড়িনি। ঋণ করে মধু কাটতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলেছি। নগদ টাকা, সরঞ্জাম সব নিয়ে গেছে। এখন পরিবার চালানো আর ঋণ পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। ডাকাতের চাপে আর বনে যাওয়া হবে না, আমরা কি খেয়ে বাঁচবো?’

মৌয়ালদের অভিযোগ, বানিয়াখালী গ্রামের বিপুল মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি দস্যুদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। বিপুল দস্যুদলের খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দস্যুদের লুট করা মধু হাসান মেম্বরের কাছে নিয়ে আসেন।

তারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউলের বাড়ি কয়রার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে। এছাড়া আল আমিন বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীসহ বেশ কয়েকটি দল সুন্দরবন দস্যুতা করছে। দস্যুদলের প্রায় সকলেই আশপাশের এলাকার। তাদের হয়ে লোকালয়ে যারা কাজ করে তারাও পরিচিত মুখ। সমাজে বসবাস করছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সরকারের প্রতি তারা জোর অনুরোধ করেন।’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন