বৃহস্পতিবার । ৫ই মার্চ, ২০২৬ । ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইফতার আয়োজন আবুধাবির শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদে

ফরহাদ হুসাইন, আমিরাত প্রতিনিধি

যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে। সুদৃশ্য মসজিদের প্রায় ৩০ একর বিস্তৃত আঙিনা জুড়ে সারিবদ্ধভাবে ইফতারে বসেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। মদিনার পর একসঙ্গে আয়োজিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইফতার আয়োজন হিসেবে এটি পরিচিত।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মসজিদটিতে চলছে বিশাল ইফতার আয়োজন। এখানে প্রতিদিন ৩৫ হাজারের বেশি রোজাদার বিনামূল্যে ইফতার করেন। দেশটির স্থপতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের নামে ১৯৯৬ সালে আবুধাবিতে প্রায় ৩০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয় এই মসজিদ। সৌন্দর্য ও বিশালতায় বিশ্বের শীর্ষ দশ মসজিদের অন্যতম এটি। এখানে একসঙ্গে প্রায় ৪২ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। রয়েছে আধুনিক সব সুবিধা।

ইফতারের দুই ঘণ্টা আগে থেকেই রোজাদাররা আসতে শুরু করেন। পরিবহননির্ভর এ শহরে মসজিদের চারপাশের সড়কে দীর্ঘ সারিতে গাড়ি দেখা যায়। নারী রোজাদারদের জন্য ১ হাজার ৫০০টিসহ মোট ৮ হাজার ৩৭৯টি পার্কিং স্পেস নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য রয়েছে আরও ৭০টি চার্জিং পয়েন্ট।

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, অভ্যর্থনা, দিকনির্দেশনা থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশন পর্যন্ত পুলিশের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল নিরলসভাবে কাজ করেন। ধনী-গরিব, শ্রমিক-পেশাজীবী, দেশি-বিদেশি কূটনীতিক— সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন এ আয়োজনে। রয়েছে পরিবার জোন, বিশেষ অতিথি জোন এবং সাধারণ মুসল্লিদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। অনেকেই বিশ্বাস করেন, অধিক মানুষের সঙ্গে একত্রে দোয়া করলে তা কবুল হয়— এই আশায় সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসেন ইফতারে। দেশটির রাজপরিবারের সদস্যরাও সাধারণ মানুষের সঙ্গে অংশ নেন; কখনও কখনও প্রেসিডেন্টও সাধারণ কাতারে বসে ইফতার করেন।

প্রত্যেকের জন্য সুদৃশ্য বক্সে খাবার পরিবেশন করা হয়। খেজুর, আপেল, কমলা, কলার পাশাপাশি থাকে বিরিয়ানি, সালাদ, সবজি ও স্যুপ। পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয় ফলের জুস, দুধ ও বোতলজাত পানি।

জানা গেছে, প্রতিদিনের এ ইফতার আয়োজনে ব্যবহৃত হয় প্রায় ১২ টন মুরগির মাংস, ৬ টন ভেড়ার মাংস এবং চাল, সবজি, টমেটো ও পেঁয়াজসহ অন্যান্য উপকরণ মিলিয়ে প্রায় ৩৫ টন খাদ্যসামগ্রী। বিশাল এ আয়োজনে কাজ করেন প্রায় ৬৫০ জন শেফ, ১৬০ জন স্টুয়ার্ড এবং ১ হাজার ৫৫০ জন ইফতারকর্মী। এছাড়া দেশটির সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা ক্লাব ও বিভিন্ন হোটেলের প্রায় এক হাজার কর্মী প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করেন।

আবুধাবির সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা ক্লাব ও হোটেলের নির্বাহী শেফ কারস্টেন গটসচাল্ক জানান, ইফতারের এক ঘণ্টা আগে থেকেই রোজাদারদের মধ্যে খাবারের বক্স বিতরণ শুরু হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে উন্নত মানের খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনে তারা সর্বোচ্চ যত্ন নেন। বিতরণ কার্যক্রমে দেশটির রেড ক্রিসেন্টের প্রায় ১ হাজার ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন।

আবুধাবির বাংলাদেশি কমিউনিটির সাহিত্য সংগঠক আবু তৈয়ব চৌধুরী বলেন, “এত বড় আয়োজনের অংশ হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এখানে ধনী-গরিব সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করেন— এটি সত্যিই বিরল অভিজ্ঞতা।”

কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন বলেন, “আমার কর্মস্থল মসজিদের কাছেই। সুযোগ পেলেই এ আয়োজনের অংশ নিই। খোলা আকাশের নিচে ইফতার করা এবং সুন্দর ব্যবস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করে।”

প্রতিদিন ইফতারের সময় কামান দাগানো হয় এবং আবুধাবি মিডিয়া ইফতার ও তারাবিহ নামাজ সরাসরি সম্প্রচার করে।

রমজানে শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের এ আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন