শনিবার । ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৭ই মাঘ, ১৪৩২

ইসলামী আন্দোলন পাশে না থাকায় দশ দলীয় প্রার্থীদের ঝুঁকি বেড়েছে

পলাশ রহমান

ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনাটি নির্বাচন কেন্দ্রিক ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। এই বিচ্ছেদের জন্য একক কোনো পক্ষকে পুরোপুরি দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়; বরং উভয় পক্ষের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অসামঞ্জস্যই পরিস্থিতিকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রথমত, দায়ের একটি বড় অংশ ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক কৌশলহীনতার উপর বর্তায়। দলটি জোট রাজনীতিকে অনেকটা নৈতিক আস্থা ও মৌখিক নিশ্চয়তার উপর ছেড়ে দিয়েছিলো। আশ্বাস, সম্ভাবনা, শঙ্কা, আস্থা ও নিশ্চয়তার প্রায় সব উপাদান দলটি জামায়াতের ঝুঁলিতে জমা রেখে- নিজেরা অন্য কাজে মনোযোগী হয়েছিলো, যদিও জোটপ্রয়াসী বাস্তব রাজনীতিতে শুধু আস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে আসন বণ্টনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আগে থেকে প্রাথমিক বোঝাপড়া ও হিসাব নিকাশ করে নেয়া জরুরি ছিলো, যা ইসলামী আন্দোলন করেনি বা করতে পারেনি।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার আমেজে ইসলামী আন্দোলন বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে। দলটির বড় নেতারা বিএনপি’র বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য, সমালোচনা নিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন প্রতিদিন। অথচ জামায়াতের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষি সহজ করতে বিএনপির সাথে যোগাযোগের দরজাটি খোলা রাখা তাদের জন্য কৌশলগত ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। একইভাবে সমঝোতার অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গেও সমান্তরাল বোঝাপড়া গড়ে না তোলা ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিহীনতা ও কৌশলগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ফলে ইসলামী আন্দোলন সমঝোতার দ্বিতীয় বড় দল হয়েও প্রভাব হীন- নিঃসঙ্গ অবস্থানে চলে যেতে হয়।

দ্বিতীয়ত, এই বিচ্ছেদের জন্য জামায়াতে ইসলামীর অতি-রাজনীতির দায় অনেক বেশি। অতীতের জোট রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে জামায়াতের আগে থেকে আঁচ করতে পারার কথা- ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সংখ্যা, আসন নির্ধারণ ও চাহিদার অসমতা শেষ মুহূর্তে জটিল ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু জামায়াত জটিলতা এড়াতে আগে থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; বরং নানা অজুহাতে ইসলামী আন্দোলনের সাথে আসন সমঝোতার বৈঠক ঝুলিয়ে রেখেছে। তারা সম্ভবত সচেতন ভাবে ইসলামী আন্দোলনকে নিরুপায় করে তুলতে চেয়েছে। বিশ্লেষকদের সন্দেহের পালে বাতাস দিয়েছে জামায়াতের নায়েবে আমির ডাক্তার তাহেরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। তিনি বলেছেন, মার্কিন দূতাবাসের বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনকে মৌলবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই দলের সাথে জামায়াতের জোটকে ভালো চোখে দেখা হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের নেতা গাজী আতাউর রহমান ডাক্তার তাহেরের এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন।

জামায়াত হয়তো ভোট ব্যাংক সম্প্রসারণ ও রাজনৈতিক শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে জোটের পরিধি বাড়াতে চেয়েছে, অথবা মার্কিন দূতাবাসের প্রেসক্রিপশনে এনসিপিসহ কয়েকটি ছোট দলকে সাথে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কৌশলগত ভূরাজনীতি মাথায় রেখে ইসলামপন্থী জোটের তকমা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় সূচনাপর্বের জোট সঙ্গী ইসলামী আন্দোলনের আস্থাকে সঙ্গে রাখা জরুরি ছিলো, যা জামায়াত করেনি। ফলে আস্থার জায়গাটি ক্রমে ক্রমে ক্ষয় হয়েছে। অতি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভিড়ে সমঝোতাটি ভেঙে গেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটির দৃশ্যমান দিক জটিল ও অসুন্দর হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী রাজনীতির অঙ্কে তাৎক্ষণিক ও নগদ ক্ষতির ভার সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে ইসলামী আন্দোলনকে। তবে একক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি কোনো কৌশলগত লাভ ঘরে তুলতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। যেমন, একক নির্বাচনের ফলে সারাদেশে ইসলামী আন্দোলনের ভোট ব্যাংক যাচাই হতে পারে। দলটির নির্বাচনি মার্কা হাতপাখা সারাদেশে আরো বেশি পরিচিতি পেতে পারে। নির্বাচনি রাজনীতিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। ভবিষ্যতের জোট রাজনীতিতে আরো বেশি সচেতন এবং কৌশলী হতে পারে। বিএনপি’র সাথে পর্দার আড়ালের রাজনীতিতে তারা খানিকটা সুবিধা পেতে পারে।

জামায়াতের জন্য নগদ ক্ষতির মাত্রা কম হলেও নির্বাচনের আগে ও দীর্ঘ মেয়াদে আস্থাহীনতার সংকটে পড়তে পারে দলটি। ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে জোট করতে আগ্রহী দলগুলো সহজে পূর্বের মতো আস্থা রাখবে না। এনসিপির মতো দলগুলোও সম্ভবত চূড়ান্ত চুক্তি ও ফাইনাল সমঝোতা সম্পন্ন না করে একসঙ্গে পথচলার চুড়ান্ত ঘোষণায় যাবে না। এর প্রভাব নির্বাচনের মূল সময়েও পড়তে পারে। জোট সঙ্গীদের মধ্যে আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষের চোখে জামায়াতের রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও ঘোষণাগুলো দ্বিধা এবং সন্দেহের উপাদান হতে পারে।

ইসলামী আন্দোলন পাশে না থাকায় অনেক আসনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরাজয়ের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো যোগ-বিয়োগ নেই। শত্রু ও মিত্র অনেক সময় প্রয়োজনের ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারিত হয়। অনেক সময় ধারণার বাইরে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে যায়। প্রাক-নির্বাচনি অনেক হিসাব শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়। তাই এই ঘটনাকে অতিরিক্ত কঠোর ভাবে বিচার না করে- কৌশলগত রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা ভালো।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন