বৃহস্পতিবার । ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়ে বিষ্ময় ‘দলীয় কোন্দল’সহ আলোচনায় যা

নিজস্ব প্রতি‌বেদক

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনের ফলাফল বিষ্ময় তৈরি করেছে সবার মাঝে। খুলনা-২ আসনে মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু জামায়াতের নবীন নেতা শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের কাছে হেরেছেন ৫ হাজার ৫৯২ ভোটে।

দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতারা পরাজয়ের কারণ হিসেবে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর অভিযোগ তুলছেন। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং নেতাকর্মীরা দিচ্ছেন ভিন্ন কারণ।

খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনটি বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী চারটি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। এবার আসনটি থেকে প্রার্থী হন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের সময়ও তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন দলটির মহানগর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। ইতোপূর্বে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। বয়সে ১৭ বছর ছোট জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালকে নিয়ে নির্ভার ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিএনপি নেতারাও একচেটিয়া বিজয়ের আশায় ছিলেন। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলের বড় একটি অংশের বিরোধিতা, জামায়াতের নারী কর্মীদের নীরব প্রচার এবং সারাদেশে দাড়িপাল্লা প্রতীকের ঢেউয়ের কারণে মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষক ও দলের নেতারা।

দলটির নেতারা জানান, ২০২১ সালে মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতাদের দূরত্ব শুরু হয়। মহানগর বিএনপির থানা, ওয়ার্ড কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয় মঞ্জু অনুসারীদের। খুলনা-২ আসনে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরও দীর্ঘদিন নিস্ক্রিয় ছিলেন তারা। পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যস্ততায় সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ শুরু করলেও পেছনে বিভীষণের ভূমিকায় ছিলেন দলের অনেকে।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সেকেন্দার আলী খান সাচ্চু বলেন, ‘কোন্দলের জন্য ইফেক্ট পড়েছে বেশি। নির্বাচনের আগে আমরা দুই অংশ এক হলেও সবাই সেভাবে কাজ করেনি। এছাড়া ধর্মীয় কারণ, প্রতারণায় পড়ে অনেকে দাড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘দুই পক্ষকে নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করলেও নেতৃত্ব ছিল মঞ্জু অনুসারীদের হাতেই। তারা ওয়ার্ড পর্যায়ের বর্তমান নেতাদের মূল্যায়নই করতেন না। কেন্দ্রভিত্তিক বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটের কাজ তেমন হয়নি।’

তবে মহানগর বিএনপির বর্তমান সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘দলের বিভেদের বিষয়টি সম্পূর্ণ মনগড়া। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। হারের কারণ আমরাও খুঁজছি।’

প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘অনেক নেটওয়ার্ক মঞ্জুকে হারাতে কাজ করেছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পোলিং অফিসারও এতে জড়িত।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, খুলনা-২ আসনে জয়ের বিষয়টি জামায়াতের হিসাবের বাইরে ছিল। দলের এ-বি কোনো ক্যাটাগরিতে খুলনা-২ আসন ছিল না। দলের প্রচার বিভাগ এবং মিডিয়াও শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালকে তেমন কাভারেজ দেয়নি। তারপরও কেন্দ্রের নির্দেশে দাড়িপাল্লা প্রতীকের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে পুরুষ ও নারী কর্মীরা নীরবে কাজ করে গেছেন। বেশিরভাগ ইউনিটে তারা একাধিকবারও ভোট চেয়েছেন। সেই তুলনায় বিএনপির ঘরে ঘরে ভোট চাওয়ার প্রক্রিয়া ছিল দুর্বল।

ভোটের দু’দিন আগে খুলনা-২ আসনে দাড়িপাল্লার প্রতীকের পক্ষে জামায়াতের নারী কর্মীদের যে মিছিল বের হয়েছিল, তা ছিল খুলনার রাজনীতিতে নারীদের সবচেয়ে বড় মিছিল। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাড়িপাল্লার পক্ষে যে হাইপ উঠেছিল তাতেও অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন। ব্যক্তির চেয়ে প্রতীকে ভোট দিয়েছেন অনেকে। যার কারণে নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের খুলনা জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা। তিনি বলেন, “খুলনা-২ আসনের ফলাফল অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘদিন ধরে পার্টির মধ্যে কোনঠাসা থেকে আবার বিরোচিত প্রত্যাবর্তন নজরুল ইসলাম মঞ্জুর মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছিল। এছাড়া দলের মধ্যে তাকে যারা তাদের রাজনীতির জন্য ঝুঁকি মনে করেন, তাদেরকে কৌশলে মোকাবেলা করতে পারেননি। দাড়িপাল্লার পক্ষে একটা জোয়ার ছিল। অনেকে ব্যক্তি নয়, প্রতীক দেখে ভোট দিয়েছে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন