সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর দেয়াল থেকে ‘জুলাই আন্দোলন’ স্মৃতিবাহী গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পোস্ট অফিস ও ফুড অফিস সংলগ্ন ডিসি বাংলোর দীর্ঘ দেয়ালজুড়ে সম্প্রতি সাদা রং করে মুছে ফেলা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আঁকা নানা গ্রাফিতি। এ সব দেয়ালে শিক্ষার্থীরা লিখেছিলেন স্বাধীনতার জয়গান, স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগান, ভালোবাসা ও মানবতার জয়ধ্বনি।
তাঁদের আঁকা গ্রাফিতিতে ছিল ‘ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর’,‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়, রক্তে রাঙা শিকল ভাঙা’,‘পানি লাগবে পানি’ ‘৩৬-শে জুলাই’ ‘মোরা ঝঞ্জার মতো উদ্দাম’ এসব চিত্র ও স্লোগান শুধু দেয়ালকে নতুন রূপ দেয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার আহ্বানও প্রকাশ করেছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তাঁরা পেশাদার শিল্পী না হয়েও শিল্পের সুষমায় দেয়ালে প্রকাশ করেছিলেন সমাজ ও রাষ্ট্র বদলের আকাঙ্খা। স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ গ্রাফিতি অঙ্কনে অংশ নেন। ফলে শহরের পথঘাটে এক ধরনের নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েক দিনের মধ্যে সেসব গ্রাফিতি সাদা রঙে ঢেকে দেওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
এ ঘটনায় গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন, ‘জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস মুছে ফেলা হলো দেয়াল থেকে।’
শহরের এক কলেজ শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা দেয়ালে যে স্বপ্ন, যে ইতিহাস লিখেছিলাম হঠাৎ মুছে ফেলা কেবল দেয়ালের রং মুছে ফেলা নয়, আমাদের আকাঙ্খাকেও মুছে ফেলার মতো।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সচেতন মহলের অনেকে এ ঘটনার জন্য জেলা প্রশাসককেই দায়ী করছেন। তাঁদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের বাংলোর দেয়াল হলেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আন্দোলনকারী তরুণদের অনুভূতি ও জনগণের অংশগ্রহণ বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাতক্ষীরার সদ্য সাবেক আহ্বায়ক আরাফাত হোসাইন বলেন, “জুলাই গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনায় আমি তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। যে কারণেই এটি মুছে ফেলা হোক না কেন, কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে পুনরায় জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কনের ব্যবস্থা করা। জেলা প্রশাসক যদি এটি না করেন, তবে তিনি কার্যত জুলাইয়ের শহীদ, আহত ও যোদ্ধাদের বিপরীতে অবস্থান করবেন।”
তিনি আরও বলেন, “যারা জুলাইয়ের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তারাই প্রকৃত ফ্যাসিস্ট। ভুলে গেলে চলবে না এই গ্রাফিতির মধ্যেই ফুটে উঠেছিল আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। সেটি মুছে ফেলা কোনোভাবেই দেশের জন্য শুভ ইঙ্গিত নয়। গ্রাফিতি কেবল দেয়ালের রঙ নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। তাই একে সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
সাতক্ষীরায় জুলাই আন্দোলনের প্রথম সংগঠক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, “জেলা প্রশাসন ২০২৪ সালের আগস্টের ২৬-২৭ তারিখের পর থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকা- ধামাচাপা দিতে চাইছে। এর মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের মূল স্পিরিট ও মূল্যবোধকে বিনষ্ট করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
খুলনা গেজেট/এনএম