শুক্রবার । ৫ই জুন, ২০২৬ । ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

পাঁচ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে অনিয়ম নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কয়রা

খুলনার কয়রায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পিলার ঢালাইয়ে মরা ও কাঁদাযুক্ত পাথর ব্যবহারের ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে মানসম্মত কিছু পাথর এনে কাজ চালু করা হলেও নিম্নমানের পাথর অপসারণসহ অনিয়মের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি নির্মাণে নানা অনিয়ম করা হচ্ছে। সেতুর ঢালাইয়ে বালু-সিমেন্টের অনুপাত ঠিক রাখা হয়নি। নিম্নমানের পাথর দিয়ে ঢালাই দেয়া হয়। রড ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইটের সামান্য আঘাতে পাথর গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। ব্রিজটি জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরেও কাজে প্রচুর ধীরগতি রয়েছে।

একপর্যায়ে মরা ও কাঁদাযুক্ত পাথর ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী গত ৩ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের ভিডিয়ো শেয়ার করেন এবং স্থানীয় সংবাদকর্মীদের অবগত করেন। নড়েচড়ে বসে কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের কর্মকর্তারা। পরে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণস্থলের এক পাশে ধূসর রঙের বিতর্কিত পাথরের স্তূপ রয়েছে, অন্য পাশে রাখা হয়েছে কালো রঙের নতুন পাথর। শ্রমিকরা নতুন মানসম্মত পাথর ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে পুরোনো পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়নি। নির্মাণস্থলে প্রকল্প-সংক্রান্ত কোনো তথ্যফলকও দেখা যায়নি। বর্ধিত মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র ২৫ দিন বাকি থাকলেও সে অনুযায়ী কাজ দৃশ্যমান হয়নি।

এ ব্যাপারে এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেছেন, স্থানীয়দের বাঁধার মুখে বিতর্কিত পাথর দিয়ে কাজ বন্ধ করা হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাতে মানসম্মত পাথর আনেন এবং সেই পাথর দিয়েই কাজ চলছে। কাজের তথ্য সমৃদ্ধ ব্যানার ছিল, তবে নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় আবু বকর, আহাদসহ বেশ কয়েকজন বলেছেন, ব্যবহারের অনুপোযোগী পাথর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজের বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কেউ তথ্য দেন না। তাদের ধারণা নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রডের ব্যবহার করা হয়নি। পুরানো পাথর সরানো না হলে সেটা পুনরায় ব্যবহার করতে পারে। তাদের দাবি, কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর মানও নিশ্চিত করতে হবে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন (কেবিএস) প্রকল্পের আওতায় কয়রার মহারাজপুর ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। উপজেলা সদর থেকে হায়াতখালি জিসি হয়ে গিলাবাড়ি জিসি সড়কের ৪ হাজার ২৫৫ চেইনেজে ‘৩৬ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ’ প্রকল্পের জন্য ২০২২ সালের ৩ আগস্ট কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ-জেডটি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ব্রিজটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭২ টাকা।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেছেন, শুধু পাথর পরিবর্তন করলেই দায় শেষ হবে না। কীভাবে নিম্নমানের সামগ্রী নির্মাণস্থলে পৌঁছালো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্রিজটি মজবুতের জন্য আগের দেওয়া সমস্ত নিম্নমানের ঢালাই তুলে ফেলে নতুন করে ভালো মানের পাথর দিয়ে এবং যথাযথ সিমেন্ট দিয়ে সেতুটির কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সাইফুল ইসলামের মোবাইলে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর ঠিকাদার জিয়াউর রহমান টিটোর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের কর্মকর্তা ( অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ শাফিন শোয়েব বলেছেন, অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন মানসম্মত পাথর আনার পরে সেটা দিয়ে কাজ হচ্ছে। নিম্নমানের পাথর সেখান থেকে অপসারণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এলজিইডি সতর্ক রয়েছে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন