ব্যবসায়ীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না, প্রার্থী হওয়ার সাহস করেননি কেউ। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সোহেলের নির্দেশে ২০২৪ সালের ৪ মে গঠন করা হয় ট্যাংকলরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের খুলনা বিভাগীয় কমিটি।
খুলনা-৩ আসনের সাবেক এমপি এস এম কামাল হোসেনের আস্থাভাজন প্রবীণ ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুলকে সভাপতি, যুবলীগ নেতা সুলতান মাহমুদ পিন্টুকে সাধারণ সম্পাদক এবং ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শেখ মিরাউল ইসলাম হন সাংগঠনিক সম্পাদক।
কমিটি গঠনের দুই মাসের মাথায় পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। সুলতান মাহমুদ পিন্টুসহ অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। পরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটেন অনেকে। সম্প্রতি জামিন পেয়ে সবাই এলাকায় ফিরেছেন। ট্যাংকলরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। সরকারী দলের নেতাদের একাংশকে ‘ম্যানেজ’ করে তারাই নিয়ন্ত্রণ করছেন খুলনার জ্বালানী তেলের ব্যবসা।
ব্যবসায়ীরা জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন সময় জ্বালানি খাত অস্থির করার চেষ্টা চালান। তুচ্ছ কারণে ধর্মঘট, চাপ প্রয়োগ করে তেল উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী নিরীহ প্রকৃতির হওয়া এবং বিএনপির একটি অংশ তাদের সঙ্গে থাকায় প্রতিবাদ করার সাহস করছেন না কেউ। সম্প্রতি যমুনা ডিপোর সেলস অফিসারকে অপসারণের দাবিতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য তেল উত্তোলন বন্ধের কর্মসূচি দিয়েছেন তারা। নিম্ন শ্রেণির এক কর্মকর্তার জন্য সারা বিভাগে তেল সরবরাহ বন্ধের এমন নজির রয়েছে অসংখ্য। এই খাতে চোরাই তেলের বিপুল অংকের টাকা লেনদেন হওয়ায় অধিকাংশ গণমাধ্যমকে তাদের পক্ষেই কথা বলতে দেখা যায়। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হতে চললেও কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে উচ্চবাচ্য করছেন না কেউই।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সব সময়ই সরকারি দলের নেতাদের নির্দেশনাতেই জ্বালানী তেলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয়। যে দল ক্ষমতায় থাকেন, সেই দলের প্রভাবশালী নেতা এবং স্থানীয় এমপিরা জ্বালানী তেল পরিবেশক সমিতি ও ট্যাংকলরী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিভাগীয় কমিটি গঠন করতেন। এই সংগঠনের ভোটাভুটি হওয়ার সুযোগ কোনো দিনই ছিল না।
২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এই কমিটি নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের অনুসারীরা। তখন সভাপতি ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফরহাদ হোসেন। নির্বাচনের পর ওই এলাকার সংসদ সদস্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমিটি পরিবর্তনের তোড়জোড় শুরু হয়। এনিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠলে শেখ সোহেল হস্তক্ষেপ করেন। ২০২৪ সালের ৪ মে যশোর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে বিশেষ সাধারণ সভায় নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ জ্বালানী তেল পরিবেশক সমিতির খুলনা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি হন আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস এবং ট্যাংকলরীর নেতৃত্ব নির্বাচিন হন অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল কয়েকযুগ ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি বিএনপির মন্ত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। পটপরিবর্তনের পর তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের আস্থাভাজন হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা, এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ছবি এখনও সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি আবার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু এক সময় বিএনপির করলেও পরে তিনি আওয়ামী যুবলীগে যোগ দেন। ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের প্রতিটি কর্মসূচিতে অর্থায়ন করতেন তিনি। সরকার পতনের পর তিনি পালিয়ে দুবলার চরে চলে যান। সেখানে কিছুদিন মাছের ব্যবসা করে আবার শহরে ফেরেন। তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। কারাভোগের পর তিনি এলাকায় ফিরে পুনরায় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ট্যাংকলরী ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ। কিন্তু নির্বাচনের নাম গন্ধ নেই। যারা নির্বাচন চাইবে তারা ওদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, নির্বাচন হলে সবার মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। এজন্য নির্বাচন ছাড়াই কেন্দ্র থেকে কখনো আলোচনার মাধ্যমে কমিটি করা হয়। এবার নির্বাচন নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সরকারের সঙ্গে কাজ করে। এখানেও সেটা হয়েছে। শেখ সোহেলের নির্দেশে কমিটি হয়েছে এই তথ্য সঠিক না।
খুলনা গেজেট/এনএম

