১৪ দিনে ৫ জনকে হত্যা, নদী থেকে দুই মরদেহ উদ্ধার

খুলনায় একের পর এক খুন, জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

নিজস্ব প্রতিবেদক

একটি হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতে আরও একটি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। লাশের মিছিল দীর্ঘ হলেও মূল অপরাধীরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত আগস্ট মাসে মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে নগরীতে তিনজন এবং জেলায় দুইজন। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা নদী থেকে আরও দুইজনের মরদেহ উদ্ধার কারে নৌ-পুলিশ। তবে এগুলো হত্যাকাণ্ড কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পুলিশ ও র‌্যাব এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা এসব হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল মাদক ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি জামিন অযোগ্য ধারায় অনেক দাগি আসামি খুব সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনে কঠোরতা আনতে পারলে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কিছুটা হলেও কমানো যেত।

পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ১২ আগস্ট রাত ১২ টা ৫৫ মিনিটের দিকে দুর্বৃত্তের গুলিতে রূপসা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখ নিহত হন। এর নেপথ্যে ছিল মাদককাণ্ড। তাদের ইট-ভাটার প্রহরী তৈয়েবের সাথে মাদক বিকিকিনির টাকা নিয়ে বিরোধ বাঁধে। সেই বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়। তবে এ ঘটনার ৪ দিন পর যশোর থেকে প্রধান শুটার ইব্রাহিম খলিল ওরফে কাটাপ্পাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৬। পরে হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় সে।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে তিনদিন পর উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামের শহীদুলের চায়ের দোকানের সামনে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় জয় ঢালী নামের অপর এক যুবককে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা থেকে রফিকুল ইসলাম হৃদয় ওরফে রাকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তিনদিনের রিমাণ্ডে নিয়েছে পুলিশ। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উজ্জল জানান।

১৮ আগস্ট রাতে দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হয় উপজেলার বাগমার গ্রামের নিয়ামত মীরের ছেলে মামুন মীর। ঘটনার রাতে দুইজন যুবক মোটরসাইকেলে তুলে এনে নৈহাটি আবু সালেহীন প্রতিবন্ধী স্কুলের সমানে তাকে গুলি করে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও এখনও তিনি ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে কারা এবং কি কারণে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করেছে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার জাহিদ বলেন, এ হামলার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ করতে আসেনি। কাউকে এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এর একদিন পর খুলনা নগরীর লবণচরা থানার হরিণটানা এলাকার আশিবিঘার বালুর মাঠে মনজুরুল নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর তিন ঘণ্টা পর একই মাঠের কিছুটা দূরে পাওয়া যায় নজমুল নামের অপর এক যুবকের মরদেহ। হত্যাকাণ্ড দু’টিকে প্রাথমিকভাবে ফুটবল খেলার দ্বন্দ্ব বলে প্রচার করা হলে পরবর্তী এর মূল কারণ পাওয়া যায়। নেপথ্য ছিল মাদক কাণ্ড এবং এলাকার আধিপত্য বিস্তার।

এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা নদী থেকে গত ২০ ও ২৭ আগস্ট এক যুবক এবং যুবতীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাদের দু’জনকে হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য নদীতে ফেলা হয়।

সর্বশেষ ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশার কার্তিককুল এলাকার নাসিরের ঘের থেকে মনিরুল ইসলাম রনির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশটি গুম করার উদ্দেশ্যে হাত-পা বেঁধে সিমেন্টের বস্তায় বালি ও মাটি দিয়ে ঘেরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে লাশটি পানিতে ভেসে ওঠে। এ ঘটনার পরদিন নিহত রনির মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি পরবর্তীতে মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেএমপি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নগরীতে যতগুলো হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে তার অধিকাংশ কারণ হল মাদক কারবার এবং এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। মাদক বন্ধ করতে পারলে হত্যার সংখ্যা কমানো সম্ভব হত। তা ছাড়া তিনি আরও বলেন, অপরাধ প্রবণতা কামানোর জন্য আইন প্রক্রিয়ার কিছু সংশোধন করা প্রয়োজন। হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ জামিন অযোগ্য ধারার আসামিরা যাতে সহজে জামিন না পাই সে ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। এসব বড় বড় মামলার আসামিরা কয়েক মাস জেল হাজত খেটে সহজে জামিন পেয়ে বাইরে এসে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন