এগারো একর জমির শসা খেত ভরে গেছে ফুলে, তবে ক্ষেতের কোথাও সে ফুল থেকে একটি ফল ধরেনি। ফল ধরার সময়ও শেষের দিকে চলে এসেছে। প্রায় ১৬ লাখ টাকা খরচ করে কৃষক আব্দুর রউফ এখন চোখে সরষেফুল দেখছেন। কীভাবে ব্যাংক ও এনজিও’র ঋণ পরিশোধ হবে সেই চিন্তায় দিশেহারা এই কৃষক। তার এই অবস্থার জন্য রাফিদ সিডস্ কোম্পানির নিম্নমানের বীজ সরবরাহকে দায়ী করছেন কপিলমুনির বীজ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে।
জানা যায়, সুরখালী ইউনিয়নের বুনোরাবাদ এলাকার কৃষক আব্দুর রউফ গত ২০২০ সালে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ১১ একর জমি হারী (বর্গা) নিয়ে বিজয় ও রাজা কোম্পানির শসা, বর্ষা মৌসুমের তরমুজ, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে আসছেন। গত ২৪ জুন পার্শ্ববর্তী পাইকগাছার কপিলমুনি বাজারের বীজ ব্যবসায়ী আশীর্বাদ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী গনেশ দেবনাথের নিকট বিজয় ও রাজা কোম্পানির শশার বীজ আনতে গেলে দোকানদার কৃষক রউফকে অনেকটা জোর করে ও ভুল বুঝিয়ে রাফিদ সিডস্ কোম্পানির প্রায় ২০ হাজার টাকার নিম্নমানের শশার বীজ ধরিয়ে দেয়।
রাফিদ সিডস্ কোম্পানির বীজ রোপণের পর চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন অতিবাহিত হলে গাছে প্রচুর ফুল আসে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ঐ ফুল থেকে একটি কোনো ফল আসেনি খেতে। অন্যদিকে, শসা গাছের ফল ধরার সময় অতিবাহিত হলে তিনি বিষয়টি আশীর্বাদ বীজ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী গনেশ ও রাফিদ সিডস্ কোম্পানির খুলনা জোনের এরিয়া ম্যানেজার রাজিব হাসানকে অবহিত করেন এবং তাদেরকে শসা খেত দেখতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ওই দুই ব্যক্তি তার কোনো কথাই কর্ণপাত করেনি।
অপরদিকে, ভুক্তভোগী কৃষক রউফ ১১ একর জমিতে শশার চাষ করে জমির হারির ৪ লাখ ৪০ হাজার, শ্রমিক খরচ প্রায় দুই লাখ টাকা, কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ ৫ লাখ টাকা, এনজিও আরএফ থেকে এক লাখ টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা, জাগরণী থেকে এক লাখ টাকা ও হীড বাংলাদেশ থেকে দেড় লাখ মিলিয়ে মোট প্রায় ১৬ লাখ টাকা খরচ করে শশার চাষ করেন। নিম্নমানের বীজের কারণে গাছে প্রচুর ফুল আসলেও ফল না ধরায় ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে কৃষক অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এ ব্যাপারে আশীর্বাদ বীজ ভাণ্ডারের মালিক ও রাফিদ সিডস্ কোম্পানির ডিলার গনেশ দেবনাথ বলেন, “আমি ঐ কৃষককে নতুন করে পছন্দের বীজ দিয়েছি।
রাফিদ সিডস্ কোম্পানির খুলনা জোনের এরিয়া ম্যানেজার রাজীব হাসান বলেন, “আমাদের রাজা ও বিজয় কোম্পানির বীজ না থাকায় ক্রয় করে আমরা ভুক্তভোগী কৃষক রউফকে নতুন করে তার পছন্দের বীজ দিয়েছি। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর সাথে আলোচনা করে ক্ষতির বিষয়ে রাফিদ সিডস্ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে অবহিত করা হয়েছে।”
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কৃষক মোঃ আব্দুর রউফ বলেন, “আশীর্বাদ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী বীজ বিক্রেতা আমাকে জোরপূর্বক আমার চাহিদার বীজের পরিবর্তে রাফিদ সিডস্ কোম্পানির নিম্নমানের বীজ দিয়ে আমার প্রায় ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি করেছে। এছাড়াও গাছে ফল না আসায় আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিভিন্ন প্রতিষেধক ঔষধ স্প্রে করি। যার কারণে আমি একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আবার নতুন করে বীজ বপন করতে হলে বর্তমানে আমার শসা খেত পরিষ্কার করতে প্রায় নতুন করে আরও ৫০ হাজার টাকার শ্রমিক লাগবে। যা বর্তমানে আমার ব্যয় করার কোনো প্রকার সামর্থ্য নেই। আমি এই ক্ষয়ক্ষতির বিচার চাই।”
এ ব্যাপারে সুরখালী বুনোরাবাদ এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “শশার বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে গাছে ফল আসার কথা। রাফিদ সিডস্ কোম্পানির নিম্নমানের বীজ হওয়ার ক্ষেতের সব গাছ পুরুষ হয়েছে। যে কারণে গাছের ফল না এসে শুধু ফুলই ধরেছে। এছাড়া রাফিদ সিডস্ কোম্পানি হাইব্রিড জাতের শশার বীজ প্যাকেট করে পরবর্তীতে প্যাকেট উপরে কোম্পানির সিল লাগিয়ে বীজ বিক্রি করেছে ডিলারের মাধ্যমে।”
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “বীজ ভাণ্ডার ও ডিলারের দোকান অন্য উপজেলায়। তারপরও অন্য উপজেলায় হলেও নকল ও নিম্নমানের বীজ বিক্রি করে আমার উপজেলার কৃষকের ক্ষতি করে পার পেয়ে যাবে এটা কখনোই হতে পারে না।” ভুক্তভোগী লিখিত আবেদন করলে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বীজ ব্যবসায়ী ও রাফিদ সিডস্ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।
খুলনা গেজেট/এনএম

