খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গেল পাঁচ দিনের ব্যবধানে খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চার জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।
এদিকে, গত ২৪ ঘন্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও ১৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গু রোগী আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলো চাপ বেড়েছে। শয্যার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন মশক নিধনসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নগরীর ওয়ার্ডগুলোকে বিভিন্ন জোনে বিভিক্ত করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে খুলনায় সোমবার একজন এবং ১৪ আগস্ট ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন ভর্তি হওয়া ১৩৫ জন রোগীর মধ্যে ১১৩ জন সরকারি হাসপাতালে এবং ২২ জন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৩ জন খুলনা জেলায় এবং ২৭ জন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। অন্যান্য জেলার মধ্যে বাগেরহাটে ২৪, যশোরে ১০, ঝিনাইদহে ৮, সাতক্ষীরায় ৫, কুষ্টিয়ায় ৪ এবং মাগুরা ও মেহেরপুরে ২ জন করে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে সর্বমোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৯০ জনে। এই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে খুলনায় ১৩জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১১ জন মারা গেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর বাগেরহাটে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩ হাজার ১৬২ জন রোগী। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ৩৮ জন রোগীকে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়েছে।
কেসিসির পরিসংখ্যান বলছে, ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে; ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ জন। পাশাপাশি রেড জোনে থাকা ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী রয়েছেন। এর বাইরে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে কমলা জোন বা মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এই পাঁচ ওয়ার্ডে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬৮। হলুদ জোন বা কম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ১১৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম বলেন, খুলনা জেনারেল হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বড় বড় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের রিপোর্ট কেসিসিতে পাঠায়। ডেঙ্গু পরীক্ষার পর পজিটিভ হওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
জানা গেছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে খুমেক হাসপাতালে ২৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ১২৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৮৭ জন ভর্তি রয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে।
এদিকে মশক নিধনে বিশেষ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে গত শনিবার থেকে কেসিসিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়েছে খুলনায় এবার দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হবে। সরকার এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। আরও ২/৩ মাস এই প্রকোপ থাকবে। খুলনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি ব্যাপক কাজ করছে। নগরবাসীকে সতর্ক করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। লিফলেট প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, খুলনা মেডিকল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। তারা সেখানে কাজ করছে। আক্রান্তের হার বিবেচনা করে চারটি ওয়ার্ডকে রেড, পাঁচটি ওয়ার্ডকে কমলা ও বাকী ওয়ার্ডগুলোকে হলুদ জোন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রের সাহায্যে মশক নিধন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালার মশা মারতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি হুইল ব্যারো ফগার মেশিন (ধোঁয়া দিয়ে মশা মারার যন্ত্র) ব্যবহার করা হচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

