মারা যাওয়ার আগে নির্জনার শেষ আর্তনাদ ছিল বাবা তুমি আমাকে আর মেরো না। কিন্তু পাষাণ বাবার হৃদয় তখনও গলেনি। তখনও সে বুঝতে পারেনি আর কিছুক্ষণ পর তার আদরের একমাত্র সন্তান দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেবে। ক্রমাগত আঘাতের কারণে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে সে। মারা যাওয়ার পর রাতে প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর মরদেহ নিয়ে শহরতলির প্রান্তিকার আবাসিক এলাকায় ফেলে দেয় বাবা আকাশ। ঘাতক বাবা গ্রেপ্তার না হওয়ায় বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ। এ হত্যার বিচার চেয়ে ২৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসের সামনে মানববন্ধন করবে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার রাতে মরদেহ নিহতের চাচা ও দাদার কাছে বুঝিয়ে দেয় পুলিশ। শনিবার বাদ ফজর নামাজে জানাজা শেষে কেসিসি’র নিরালা কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
এলাকার একটি সূত্র জানায়, পরিবারের সদস্যদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুইবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় নির্জনা। দুইবারই তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ ১৭ এপ্রিল পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান খোকনের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে বিয়ে করে। সেখানে ১৫ দিন সংসার করার পর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয় তাকে। এরপর থেকে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করানোর জন্য চাপ প্রয়োগসহ তার ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। উচ্চস্বরে গান চালিয়ে তাকে মারধর করা হতো।
সূত্রটি আরও জানায়, মেয়ের পছন্দে বিয়ে করা ছেলেটির আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় নির্জনার বাবা-মা তাকে জামাই হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইনি। স্ত্রীর সাথে দেখা করতে আসলে কখনও তাকে দেখা করতে দেওয়া হতোনা। বাবার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গত বুধবার হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল সোয়া ১০টার দিকে স্বামীর সাথে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। বাড়ি থেকে বের হয়েও গিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রাস্তা থেকে ধরে ফেলা হয় তাকে। সেখান থেকে মারতে মারতে বাড়িতে নেওয়া হয় নির্জনাকে। সারাদিন তার ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। সন্ধ্যার দিকে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে তাকে পেটাতে থাকে আকাশ। এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে মেয়েটি। পরবর্তীতে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মেয়ের মরদেহ মোটরসাইকেল করে ফেলে দেওয়া হয় প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নং সড়কের একটি বাড়ির সামনে। রাতে আকাশ ও তার স্ত্রী বাড়িতে অবস্থান করে। সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নির্জনার মরদেহ’র ছবি প্রচার করা হলে দুপুরে তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তাদের ভেতর কোনো ধরনের অনুভূতি বা অনুশোচনা দেখা যায়নি।
বসুপাড়া মেইন রোডের ৮৯ নং বাড়ি নির্জনা নীড়ের পরিবেশ ছিল শুনশান নিরাবতা। সেখানে ছিল না কারও কোনো ব্যস্ততা। বাড়ির সামনে কয়েকটি হাঁস দেখা যায়। প্রাণীগুলোর পরিচর্যা করছিলেন আসমা বেগম নামের ষাটোর্ধ্ব এক নারী। তিনি বলেন, পান থেকে চুন খসলে মেয়েটিকে মারত তার বাবা। বুধবার সকালে বাড়ি থেকে বের হলে তাকে ধরে নির্মমভাবে মারধর করে সে। সর্বশেষ সন্ধ্যার কিছু আগে বাবাকে বলতে শোনা গেছে আর আমাকে মেরো না। এরপর আর কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। মাগরিবের আযানের পর থেকে বাড়ির সব লাইট বন্ধ হয়ে যায়। রাত ৮টার দিকে প্লাস্টিকের বস্তায় করে কী যেন মোটরসাইকেলে তুলে বাইরে যায় আকাশ। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে বিষয়টি জানাজানি হয়। এর আগে স্বামী আকাশ ও স্ত্রী সীমা রিকশায় করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানতে পারলাম সন্তান হত্যার দায়ে নির্জনার মাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশী বলেন, আকাশ একজন মাদক সেবন ও কারবারি। প্রায় পুলিশ তাদের বাড়িতে আসত।
এদিকে শনিবার সকালে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও মায়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে কেএমপি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, নির্জনার বাবার সন্ধানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন বাহিনী কাজ করছেন। খুব দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

